• সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১২:৫৫ পূর্বাহ্ন

ট্রাম্পের ১৫ দফার টোপ: কঠিন শর্তের বেড়াজালে কী পেতে যাচ্ছে ইরান?

Reporter Name / ১৬৬ Time View
Update : বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন যুদ্ধের কালো মেঘে ঢাকা এবং উত্তেজনার পারদ যখন চরমে, ঠিক সেই মুহূর্তে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়েছে একটি নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ। দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে একটি ১৫ দফা শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে জানা গেছে, পাকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি মধ্যস্থতাকারী দেশের মাধ্যমে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই বার্তার আদান-প্রদান চলছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি শান্তি চুক্তি মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে তেহরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি খর্ব করার এক সুদূরপ্রসারী কৌশল। তবে শর্তের পাহাড় চাপিয়ে দিলেও, চুক্তির উল্টো পিঠে ইরানের ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির জন্য রাখা হয়েছে বড় ধরনের পুরস্কারের হাতছানি।

পরমাণু কর্মসূচিতে লাগাম টানার কঠোর রূপরেখা

ট্রাম্পের পাঠানো এই ১৫ দফার প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় এবং সংবেদনশীল অংশটি আবর্তিত হয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে। আলোচনার একটি সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি করতে চুক্তির একেবারে শুরুতেই প্রাথমিকভাবে এক মাসের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। এরপরই ইরানকে তাদের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাটি বিসর্জন দিতে হবে। নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদোর মতো অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পুরোপুরি বন্ধ ও ধ্বংস করে ফেলার কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, বর্তমানে ইরানের হাতে যত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে, তার পুরোটাই আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কাছে হস্তান্তর করতে হবে অথবা দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে, ইরানের নিজস্ব ভূখণ্ডে নতুন করে কোনো ধরনের পারমাণবিক উপাদান বা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার পথ চিরতরে বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। এসব কার্যক্রম তদারকি করার জন্য আইএইএ-কে ইরানের যেকোনো পারমাণবিক স্থাপনায় সম্পূর্ণ, স্বচ্ছ ও বাধাহীন প্রবেশের অধিকার দিতে হবে। চুক্তি চূড়ান্ত করার আগে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের চেষ্টা করবে না—এই মর্মে একটি আনুষ্ঠানিক ও লিখিত নিশ্চয়তাও প্রদান করতে হবে।

প্রক্সি যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ

পারমাণবিক কর্মসূচির বাইরেও ইরানের ভূরাজনৈতিক প্রভাব কমানোর দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে এই প্রস্তাবে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হয়ে কাজ করা বিভিন্ন সশস্ত্র বা প্রক্সি গোষ্ঠী, বিশেষ করে হিজবুল্লাহর মতো সংগঠনগুলোকে অর্থ, অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করার শর্ত দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, তেহরানের গর্বের জায়গা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়ন ও পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ও পাল্লা এমন একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নামিয়ে আনতে হবে, যা কেবল নিতান্তই আত্মরক্ষার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একটি বড় শর্ত রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ সব সময়ের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে। এই প্রণালিকে একটি ‘মুক্ত সামুদ্রিক অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে, যেখানে কোনো দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিন্দুমাত্র বাধা দেওয়া বা হুমকি সৃষ্টি করা যাবে না।

শর্তের বিনিময়ে মিলবে যেসব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা

যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এই শর্তগুলো তেহরানের জন্য নিঃসন্দেহে অত্যন্ত কঠোর এবং অপমানজনক মনে হতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, ইরান যদি এই শর্তগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করে, তবে তাদের জন্য অভাবনীয় কিছু সুবিধাও অপেক্ষা করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সুবিধাটি হলো, বছরের পর বছর ধরে ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া সমস্ত পারমাণবিক ও মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি এবং চিরতরে প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। এর ফলে ইরান পুনরায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় স্বাধীনভাবে যুক্ত হতে পারবে এবং বিদেশে আটকে থাকা তাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ পাবে। সামরিক পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করলেও, জ্বালানি চাহিদা মেটানোর জন্য জাতিসংঘের কড়া নজরদারিতে বুশেহরে বা দেশের বাইরে ‘বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প’ গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সর্বাত্মক সহায়তা করবে। এছাড়া, চুক্তির সামান্য বরখেলাপের অজুহাতে ভবিষ্যতে হুট করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবারও নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়ার যে ‘স্ন্যাপব্যাক পদ্ধতি’ আন্তর্জাতিক আইনে রয়েছে, সেটিও বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এক কথায়, এই চুক্তি মেনে নিলে ইরান তাদের যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অবরুদ্ধ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার এক বিশাল সুযোগ পাবে।

তেহরানের অবিশ্বাস ও পাল্টা শর্তের সমীকরণ

যুক্তরাষ্ট্রের এই অভাবনীয় ও লোভনীয় প্রস্তাবে ইরান যে খুব একটা আশাবাদী বা উচ্ছ্বসিত, তা কিন্তু নয়। অতীতের নানা তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং চুক্তিভঙ্গের কারণে ওয়াশিংটনের ওপর তেহরানের গভীর অবিশ্বাসের এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়ে আছে। ইরানের সামরিক ও কট্টরপন্থি রাজনৈতিক নেতারা মনে করছেন, এটি কেবল মার্কিন রণকৌশলের একটি অংশ এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সেনা মোতায়েনের জন্য সময়ক্ষেপণের একটি কূটচাল মাত্র। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এই ১৫ দফার কথা স্বীকার না করলেও, যুদ্ধ বন্ধের জন্য পাল্টা বেশ কিছু কঠিন শর্ত ছুড়ে দিয়েছেন। যার মধ্যে অন্যতম হলো, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়া এবং গত কয়েক বছরের যুদ্ধে ইরানের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ প্রদান করা। এই জটিল ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্পের এই ১৫ দফার কঠিন শর্ত এবং অর্থনৈতিক সুবিধার টোপ গিলে ইরান শান্তির পথে হাঁটে, নাকি নিজেদের সামরিক অহংকার ধরে রাখতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতকে আরও ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়।

ট্রাম্পের ১৫ দফা শান্তি প্রস্তাব: শর্ত ও সুবিধা
ক্রমিক প্রস্তাবিত শর্তসমূহ (ইরানকে যা মানতে হবে)
প্রাথমিকভাবে এক মাসের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা।
নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদোর মতো প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করা।
বর্তমানে মজুতকৃত সব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের (আইএইএ) কাছে হস্তান্তর করা।
নিজস্ব ভূখণ্ডে নতুন করে কোনো ধরনের পারমাণবিক উপাদান বা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ না করা।
আইএইএ-কে সব পারমাণবিক স্থাপনায় সম্পূর্ণ, স্বচ্ছ ও বাধাহীন তদারকির সুযোগ দেওয়া।
হিজবুল্লাহসহ মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা বন্ধ করা।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি স্থগিত রাখা এবং এর সংখ্যা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নামিয়ে আনা।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত রাখা।
হরমুজ প্রণালিকে ‘মুক্ত সামুদ্রিক অঞ্চল’ ঘোষণা করা এবং জাহাজ চলাচলে বাধা না দেওয়া।
১০ কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের চেষ্টা না করার লিখিত ও আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা দেওয়া।
ক্রমিক শর্ত মানলে ইরানের প্রাপ্ত সুবিধাসমূহ
দীর্ঘদিনের পারমাণবিক ও মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি এবং চিরতরে প্রত্যাহার।
জাতিসংঘের কড়া নজরদারিতে ‘বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প’ গড়ে তুলতে মার্কিন সহায়তা।
চুক্তির বরখেলাপের অজুহাতে হুট করে নিষেধাজ্ঞা চাপানোর স্বয়ংক্রিয় ‘স্ন্যাপব্যাক পদ্ধতি’ বাতিল।
বিদেশে আটকে থাকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ফেরত আনা এবং ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি পুনর্গঠনের সুযোগ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category