• বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ০৭:৩৫ পূর্বাহ্ন
Headline
বার্ধক্য বুড়ো বয়সে নয়- শুরু হয় আজ: সাতটি সতর্কবার্তা রেলযাত্রায় আসছে বৈদ্যুতিক ট্রেন, মেগা সেতুসহ মহাসড়কে এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিডের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর শুভেন্দুর ‘ডিপোর্ট’ নীতি মানবাধিকারের লঙ্ঘন: এইচআরডব্লিউ চালের বাজারে কোনো ঊর্ধ্বগতি নেই: বাণিজ্যমন্ত্রী দেশের ৭৫টি কারাগারে ধারণক্ষমতার ১.৭ গুণ বন্দি রয়েছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনগণের অর্থ পাচার হতে দেওয়া হবে না, সতর্ক করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে দেশব্যাপী ক্রিয়েটিভ হাবের পরিকল্পনা সরকারের ভিকটিম ব্লেমিং বন্ধ ও সাইবার সুরক্ষার তাগিদ প্রভার এআই ট্রাফিক মামলার আড়ালে ভয়ঙ্কর সাইবার জালিয়াতি ১৫ কোটি রুপি ও প্রাইভেট জেটে এমপি ‘বিক্রি’ হচ্ছে ভারতে: সঞ্জয় রাউত

নথিতে ‘রেকর্ড মজুত’, বাস্তবে হাহাকার

Reporter Name / ৬৮ Time View
Update : রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের মজুত এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে—সরকার ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পক্ষ থেকে এমন আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে বারবার। সরকারি নথিপত্র আর মন্ত্রীদের বক্তব্যে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন ও ভয়াবহ। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের পেট্রোল পাম্পগুলোতে বিরাজ করছে তীব্র হাহাকার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত তেল না পেয়ে ক্ষোভ, হতাশা আর চরম ভোগান্তি নিয়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও পাম্পগুলো কেন দিনের পর দিন বন্ধ থাকছে? এত বিপুল পরিমাণ তেল আসলে যাচ্ছে কোথায়? সরকারের আশ্বাসের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের এই বিস্তর ফারাক জনমনে চরম ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রায় দেড় মাস ধরে চলা এই জ্বালানিসংকটের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এখন প্রায় স্থবির হওয়ার উপক্রম।

তীব্র তাপদাহে দীর্ঘ লাইন, কাঠফাটা রোদে অসুস্থ হচ্ছেন বাইকাররা

রাজধানীর মৎস্য ভবন, পরীবাগ, তেজগাঁও, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলো ঘুরে দেখা গেছে এক অভূতপূর্ব বিশৃঙ্খল চিত্র। প্রতিটি পাম্পের সামনে শত শত গাড়ি, সিএনজি অটোরিকশা এবং মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। কোথাও কোথাও এই সারি এক থেকে দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত ছাড়িয়ে প্রধান সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি করছে।

সবচেয়ে বেশি অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন মোটরসাইকেল চালক ও রাইড শেয়ারিং সেবায় যুক্ত যুবকরা। বর্তমানে দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তীব্র তাপদাহ। এই কাঠফাটা রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে অনেকেই চরমভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা এবং হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে পাম্পের লাইনে।

পরীবাগের মেঘনা ফিলিং স্টেশনে ভোর ৫টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেল চালক রঞ্জিত মল্লিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সকাল থেকে এই প্রচণ্ড রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, মাথা ঘুরছে। কিন্তু পাম্পের কর্মীরা বলছেন তেল নেই। মন্ত্রীরা এসি রুমে বসে বলছেন ইতিহাসের রেকর্ড মজুত আছে, তাহলে আমাদের এই রোদে পুড়ে মরতে হচ্ছে কেন? এই তেল কোথায় যাচ্ছে?”

একই চিত্র দেখা যায় মৎস্য ভবন এলাকার পাম্পগুলোতে। শুক্রবার রাত থেকে সেখানে গাড়ির সারি। শনিবার দুপুরে সেই সারি আরও দীর্ঘ হতে দেখা যায়। খালেদ হোসেন নামের এক প্রাইভেটকার চালক বলেন, “শুক্রবার রাত ১১টায় এসে সিরিয়াল নিয়েছি। এখন পরের দিন দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, তৃষ্ণায় আর গরমে গাড়ির ভেতরে টেকা যাচ্ছে না, অথচ এখনো এক ফোঁটা তেল পাইনি।”

সরকার ও বিপিসির দাবি: ‘ইতিহাসের সর্বোচ্চ মজুত’

মাঠপর্যায়ে যখন এই হাহাকার, তখন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সম্প্রতি এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জোর দিয়ে বলেছেন, “দেশের ইতিহাসে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। আমাদের এপ্রিল ও মে মাসের পূর্ণ চাহিদার পাশাপাশি জুন মাসের জন্যও পর্যাপ্ত তেলের নিশ্চয়তা রয়েছে। ঘাটতির কোনো শঙ্কা নেই।”

বিপিসির কর্মকর্তারা এই সংকটের পেছনে ভিন্ন যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন। তাদের দাবি, পাম্পগুলোতে মূলত ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের ভিড় বেড়েছে, ফলে জ্বালানির (বিশেষ করে অকটেন ও পেট্রোল) চাহিদা হঠাৎ করে প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের চাহিদার পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে তেল সরবরাহ করায় অনেক পাম্প প্রতিদিনের বাড়তি চাহিদা মেটাতে পারছে না। মানুষের মধ্যে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কজনিত মজুতের প্রবণতাও এই সংকটকে ঘনীভূত করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রবিবার থেকে অকটেনের সরবরাহ ২৫ শতাংশ এবং পেট্রোল ও ডিজেলের সরবরাহ ১০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিপিসি।

পাম্প মালিকদের আক্ষেপ: ‘মরুভূমিতে এক বালতি পানি’

সরকার পর্যাপ্ত সরবরাহের কথা বললেও বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বলছে অন্য কথা। তাদের মতে, এটি সরবরাহের ঘাটতি নয়, বরং চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ চরম মাত্রায় কম হওয়ার ফল।

অ্যাসোসিয়েশনের একাংশের সভাপতি নাজমুল হক জানান, ঢাকার বাইরের অনেক পাম্পে মাসে মাত্র ১৫ থেকে ২০ দিনে একবার তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। বাকি দিনগুলোতে পাম্প বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা।

আরেক অংশের সদস্য সচিব মীর আহসান উদ্দীন পারভেজ বর্তমান পরিস্থিতিকে এক ভয়াবহ রূপকের সাহায্যে তুলে ধরে বলেন, “বাড়তি চাহিদার কারণে অনেক পাম্প মাসের শুরুতেই তাদের পুরো মাসের বরাদ্দ শেষ করে ফেলছে। সরকার যে তেল দিচ্ছে, তা বর্তমান চাহিদার তুলনায় এতটাই নগণ্য যে—এটা যেন মরুভূমিতে এক বালতি পানি ঢালার মতো অবস্থা। পাম্পে তেল দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা শেষ হয়ে যাচ্ছে।”

কোথায় যাচ্ছে তেল? অবৈধ মজুত ও কালোবাজারির ছায়া

পাম্পে তেল না থাকলেও খোলাবাজারে চড়া মূল্যে ঠিকই মিলছে জ্বালানি। এতে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, একটি বড় অসাধু চক্র এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কালোবাজারিতে লিপ্ত হয়েছে। অবৈধ মজুত ও পাচার রোধে সারা দেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করেছে প্রশাসন।

নোয়াখালীতে ১ হাজার ৪০০ লিটার অবৈধ ডিজেলসহ চারজনকে আটক করা হয়েছে। নওগাঁর আত্রাইয়ে ১১২ লিটার পেট্রোল জব্দ করা হয়েছে। কুড়িগ্রাম সীমান্তে জ্বালানি পাচার ঠেকানোর ঘটনাও সামনে এসেছে। রংপুরের পীরগঞ্জে লাইনে থাকা সাধারণ গ্রাহককে বাদ দিয়ে প্রভাবশালীদের কাছে ড্রামে ভরে তেল বিক্রির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। অনেক জায়গায় পাম্পের বাইরে অবৈধভাবে বোতলে বা ড্রামে ভরে কয়েকগুণ বেশি মুনাফায় তেল বিক্রি করছে অসাধু চক্র।

দেশজুড়ে জ্বালানিসংকটের ভয়াবহ খণ্ডচিত্র

রাজধানীর বাইরে সারা দেশের পরিস্থিতি আরও শোচনীয়। বিভিন্ন বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বর্তমান পরিস্থিতির একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে:

  • চট্টগ্রাম বিভাগ: বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের প্রায় ৪০ শতাংশ পাম্প বর্তমানে বন্ধ। যেসব পাম্প খোলা আছে, সেখানে সপ্তাহে মাত্র এক বা দুই দিন তেল মিলছে। তেল আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা ফুরিয়ে যাচ্ছে, ফলে পরিবহন ব্যবসায় বড় ধরনের ধস নেমেছে।

  • সিলেট বিভাগ: বিপিসির নতুন রেশনিং নীতির কারণে এই বিভাগে প্রায় ৯০টি ছোট পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে। পাম্প মালিকরা জানিয়েছেন, তারা দুই দিনের বেশি তেল মজুত রাখতে পারছেন না, ফলে গ্রাহকরা ফিরে যাচ্ছেন।

  • রাজশাহী বিভাগ: এই বিভাগে বরাদ্দকৃত তেল এক দিনেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে এক দিন পাম্প খোলা থাকলে পরবর্তী তিন দিন বাধ্য হয়ে পাম্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে কৃষি ও সেচ কাজ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

  • বরিশাল বিভাগ: সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক এতটাই তীব্র যে, তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনে মজুত করছেন। ফলে দ্রুত তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং সপ্তাহের অর্ধেকের বেশি সময় পাম্পগুলো তেলশূন্য থাকছে।

  • ময়মনসিংহ বিভাগ: সাত দিনের জন্য বরাদ্দ করা তেল বিক্রি হয়ে যাচ্ছে মাত্র ছয় ঘণ্টায়। ভোর রাত থেকেই পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার বিশাল লাইন চোখে পড়ছে।

  • খুলনা বিভাগ: চাহিদার তুলনায় ২০ শতাংশ কম সরবরাহ করা হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতে। খুলনার ডুমুরিয়ায় মোটরসাইকেল ও কৃষিযন্ত্রের বিক্রি প্রায় বন্ধ। আগে যেখানে মাসে শতাধিক মোটরসাইকেল বিক্রি হতো, এখন তা ১৫-২০টিতে নেমে এসেছে।

  • রংপুর বিভাগ: এই বিভাগে কৃত্রিম সংকট ও কালোবাজারি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আতঙ্কের কারণে চাহিদা বহুগুণ বেড়ে গেছে, আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা গোপনে চড়া দামে তেল বিক্রি করছে।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ ও সতর্কতা

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম মনে করেন, এই সংকটের পেছনে শুধু সরবরাহের ঘাটতি দায়ী নয়। তিনি বলেন, “সরকার হয়তো আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকায় সরবরাহ পর্যাপ্ত বাড়াতে পারছে না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিটি আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত চাহিদা, কালোবাজারি, অব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতার এক সম্মিলিত ফল।”

তাঁর মতে, মানুষের আতঙ্ক কমাতে হলে সবার আগে সরবরাহের দৃশ্যমান বৃদ্ধি ঘটাতে হবে এবং তেল বিক্রির সীমার ওপর কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।

আরেক জ্বালানি বিশ্লেষক অধ্যাপক এম তামিম বলেন, “সরকার বারবার মজুতের কথা বলছে; কিন্তু সেই তেল কীভাবে এবং কোন পথে বাজারে পৌঁছাচ্ছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। অবৈধ মজুত ও কালোবাজারি পরিস্থিতিকে চরম আকার ধারণ করতে সাহায্য করেছে। সরকারি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা না কাটালে শুধু মজুত দিয়ে এই সংকট দূর করা যাবে না।”

সব মিলিয়ে, সরকারি নথির ‘রেকর্ড মজুত’ আর ফিলিং স্টেশনের বাস্তবের মধ্যে যে দুস্তর ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তার চরম মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি দূর করে কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে, এই জ্বালানিসংকট দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও জনজীবনে এক অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category