প্রায় দুই দশক আগে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক ‘প্রত্ন কেলেঙ্কারি’র ঘটনাটি দেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। ২০০৭ সালে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন জরুরি অবস্থা ও তীব্র উত্তাপ বিরাজ করছিল, এবং একই সময়ে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’-এর আঘাতে জনজীবন বিপর্যস্ত ছিল, ঠিক সেই সুযোগে দেশের অমূল্য সব পুরাকীর্তি ফ্রান্সের গিমে জাদুঘরে প্রদর্শনীতে পাঠানোর এক চরম বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বিশেষজ্ঞদের প্রবল আপত্তি, আইনি জটিলতা এবং সংস্কৃতিকর্মীদের তীব্র আন্দোলনের মুখেও রাতের অন্ধকারে বিমানে করে পাঠানো সেই প্রত্নসম্পদগুলো আদৌ আসল রূপে দেশে ফিরেছে নাকি সেগুলোর পরিবর্তে কোনো নকল রেপ্লিকা হস্তান্তর করা হয়েছে— তা খতিয়ে দেখতে দীর্ঘ সময় পর এক বড় পদক্ষেপ নিয়েছে বর্তমান সরকার। বগুড়ার মহাস্থানগড় প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর থেকে পাঠানো নিদর্শনগুলো পরীক্ষা করতে একটি বিশেষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের প্রাচীনতম ঐতিহাসিক স্থান মহাস্থানগড়ে খননকাজের সঙ্গে যুক্ত ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিকরা শুরু থেকেই এখানকার পুরাকীর্তিগুলো ফ্রান্সে প্রদর্শনের বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়ে আসছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের ৩১শে জুলাই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব এবিএম আবদুল হক চৌধুরী এবং ঢাকায় নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যাক আংগ্রি কস্টিলেস একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির আওতায় ঢাকার জাতীয় জাদুঘর, রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর এবং ময়নামতি জাদুঘর থেকে প্রায় ১৮৭টি অতি মূল্যবান ও প্রাচীন নিদর্শন প্যারিসের গিমে জাদুঘরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়। এসব নিদর্শনের মধ্যে ছিল প্রাচীন মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন রাজবংশের আমলের বিরল শিলালিপি, মুদ্রা, পোড়ামাটির ফলক এবং ঐতিহাসিক মূর্তি।
তবে এই সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে দেশের সুশীল সমাজ ও সংস্কৃতিকর্মীদের মাঝে। এই চুক্তির স্বচ্ছতা ও দেশের স্বার্থকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হলে আদালত পুরাকীর্তি বিদেশে পাঠানোর ওপর দুই মাসের অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ জারি করে। একই সাথে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ঢাকা ও রাজশাহীতে একাধিক মামলাও দায়ের করা হয়। কিন্তু তৎকালীন সরকার এই স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলে সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের আদেশটি স্থগিত করে দেয়, যার ফলে আমলাতান্ত্রিক উপায়ে পুরাকীর্তি পাঠানোর আইনি বাধা দূর হয়ে যায়।
সরকারের এই একতরফা চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে দেশের প্রায় দুই ডজন শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেন। তারা এই ১৮৭টি প্রাচীন নিদর্শনের নিরাপত্তা বীমা হিসেবে চুক্তিতে মাত্র ১০ কোটি টাকা নির্ধারণ করাকে একটি ‘অবিশ্বাস্য আর্থিক জালিয়াতি’ হিসেবে অভিহিত করেন। এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছিলেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী, সনজিদা খাতুন, কবি বেলাল চৌধুরী এবং সাংবাদিক কামাল লোহানীর মতো বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ। তাদের মূল শঙ্কা ছিল, আন্তর্জাতিক পরিবহনের সময় বা যুদ্ধবিগ্রহের কোনো পরিস্থিতিতে এই জাতীয় সম্পদ চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে কিংবা চুরি হতে পারে।
জনগণের এই প্রবল ক্ষোভ ও বিক্ষোভ এড়াতে তৎকালীন সরকার এক চতুর কৌশল অবলম্বন করে। ২০০৭ সালের ৩০শে নভেম্বর, একটি ছুটির দিনকে (শুক্রবার) বেছে নিয়ে জাতীয় জাদুঘরের ভেতরে গোপনে ৪২টি পুরাকীর্তি বাক্সবন্দি করা শুরু হয়। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সংস্কৃতিকর্মীরা জাদুঘরের মূল ফটক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে আন্দোলনকারীদের ব্যাপক ধস্তাধস্তি ও সংঘর্ষ হয়। অবশেষে গভীর রাতে কড়া পুলিশি পাহারায় বিক্ষোভকারীদের হটিয়ে দিয়ে সেই পুরাকীর্তির বাক্সগুলো বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ফরাসি কার্গো বিমানে করে প্যারিসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
প্রথম চালানের সফলতার পর সরকার ২১শে ডিসেম্বর আরও ১৪৫টি প্রাচীন প্রত্ননিদর্শন সম্বলিত দ্বিতীয় চালানটি বিমানবন্দরে পাঠায়। কিন্তু ফরাসি কার্গো বিমানে বাক্সগুলো তোলার পর তালিকার সাথে পুনরায় মেলানোর সময় দেখা যায়, একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাক্স গায়েব। নিখোঁজ হওয়া সেই বাক্সে ছিল প্রায় দেড় হাজার বছরের প্রাচীন দুটি মূল্যবান বিষ্ণুমূর্তি। পরবর্তীতে রানওয়ের অদূরে একটি জরাজীর্ণ জলাশয় থেকে খালি বাক্সটি উদ্ধার করা হলেও মূর্তি দুটি পাওয়া যায়নি।
এই চাঞ্চল্যকর চুরির ঘটনায় পুরো দেশে তীব্র আলোড়ন ও তোলপাড় তৈরি হয়। তৎকালীন সংস্কৃতি উপদেষ্টা আইয়ুব কাদরী দাবি করেন, ফরাসি এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের কাছে মালামাল আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরের পরেই এই চুরির ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে ঢাকার ফরাসি embassy বা দূতাবাস এই ঘটনাকে ‘অত্যন্ত সন্দেহজনক’ আখ্যা দিয়ে দ্রুত তদন্তের দাবি জানায়। ঘটনার পর দ্বিতীয় চালানের বাকি ১৪৩টি পুরাকীর্তি পুনরায় জাতীয় জাদুঘরে ফেরত আনা হয় এবং বিমানবন্দর থানায় একটি বড় মামলা করা হয়।
মূর্তি চুরির কিনারা করতে পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে ব্যাপক তদন্তে নামে। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বিমানবন্দরের একাধিক কর্মচারীকে। একপর্যায়ে সিভিল এভিয়েশনের দুজন গাড়িচালক এবং একজন সাবেক পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাভারের বলিয়ারপুরের একটি বিশাল ময়লাখানায় দিনভর অনুসন্ধান চালিয়ে সপ্তম শতাব্দীর সেই মহামূল্যবান বিষ্ণুমূর্তি দুটির প্রায় ২৯টি খণ্ডিত টুকরো উদ্ধার করা হয়। জানা যায়, চোর চক্রটি মূর্তি দুটিকে সাধারণ পাথর বা নকল ভেবে ভেঙে ফেলে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিল, যা পরে সিটি কর্পোরেশনের ময়লার গাড়িতে করে সাভারের ময়লাখানায় চলে যায়।
এই চরম সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের মুখে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এবং সুশীল সমাজ তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির তৎকালীন শীর্ষ নেতারা যৌথভাবে সরকারের এই অবহেলার কঠোর সমালোচনা করেন। প্রতিবাদের মুখে ২৬শে ডিসেম্বর তৎকালীন সংস্কৃতি উপদেষ্টা আইয়ুব কাদরী নৈতিক কারণে পদত্যাগপত্র জমা দেন, যা পরদিন রাষ্ট্রপতি গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় রাশেদা কে চৌধুরীকে।
চুরি এবং দেশীয় বিক্ষোভের তীব্রতার মুখে ফরাসি জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সাথে প্রদর্শনীর চুক্তি বাতিল করে ২০০৮ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি প্রথম চালানে পাঠানো ৪২টি প্রত্ননিদর্শন একটি বিশেষ কার্গো বিমানে করে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তৎকালীন সংস্কৃতি উপদেষ্টার কাছে ফরাসি জীবনের কর্মকর্তারা পুরাকীর্তিভরা ১০টি বাক্স আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন।
তবে দীর্ঘ ১৪ বছর পার হয়ে গেলেও একটি বড় প্রশ্ন এবং সংশয় দেশের মানুষের মনে রয়েই গেছে—ফ্রান্স থেকে ফেরত আসা এই পুরাকীর্তিগুলো কি সত্যিই আসল, নাকি কোনো রেপ্লিকা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল? এই রহস্য উদঘাটনে বর্তমান সরকার সম্প্রতি একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, মহাস্থানগড় জাদুঘরে দীর্ঘদিন ধরে বাক্সবন্দি থাকা সেই প্রাচীন নিদর্শনগুলো সরেজমিনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে যে সেগুলোর সব অরিজিনাল কি-না। এই তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই রাষ্ট্রীয় সম্পদের সত্যতা নিশ্চিত করা হবে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা