হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকার কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে যে নজিরবিহীন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, তা অচিরেই গোটা বিশ্বকে একটি ভয়ংকর খাদ্য সংকটের দিকে ধাবিত করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ এমন উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দিয়েছেন। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, ইউরোপীয় দেশগুলোতে উড়োজাহাজের জ্বালানি বা জেট ফুয়েলের মজুত একেবারে তলানিতে ঠেকেছে, যা দিয়ে বড়জোর আর দেড় মাস (ছয় সপ্তাহ) চলা সম্ভব। বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান এই দ্বন্দ্বের দ্রুত অবসান বা সমঝোতা না হলে দীর্ঘমেয়াদি এই ধ্বংসাত্মক সংকট এড়ানো কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।
মহামন্দা ও দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি
বিশ্বব্যাংকের বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা বিশ্বে এরই মধ্যে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ মারাত্মকভাবে খাদ্যাভাবে ভুগছে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট অচলাবস্থার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি মারাত্মক মন্দার কবলে পড়তে যাচ্ছে। এর ফলে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ (২০ শতাংশ) মানুষ নতুন করে ভয়াবহ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারে।
সারের দাম বৃদ্ধি ও মজুতপ্রবণতা
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক নৌরুট বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে পেট্রোলিয়াম-ভিত্তিক কাঁচামালনির্ভর সারের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে। কৃষিখাতে সারের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেক দেশ নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় খাদ্যপণ্য রপ্তানি বন্ধ করে মজুত বাড়াতে শুরু করতে পারে। আর এমনটি হলে রাতারাতি বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এর পাশাপাশি যুদ্ধকেন্দ্রিক বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও রপ্তানি নিষেধাজ্ঞাও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের চরম উদ্বেগে ফেলেছে।
এশিয়া ও আফ্রিকায় বেশি ঝুঁকির আশঙ্কা
এই বৈশ্বিক সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে রয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলো। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্স তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহ ঘাটতি এবং এর অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব প্রাথমিকভাবে এশিয়া মহাদেশে সবচেয়ে বেশি আঘাত হানছে। তবে এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে তা খুব দ্রুত আফ্রিকার দেশগুলোতেও মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়বে।
ইউরোপের আকাশপথে স্থবিরতার শঙ্কা
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় ইউরোপও চরম জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান সতর্ক করে জানিয়েছেন, ইউরোপের দেশগুলোর হাতে যে পরিমাণ জেট ফুয়েল অবশিষ্ট আছে, তা দিয়ে বড়জোর ছয় সপ্তাহের চাহিদা মেটানো সম্ভব। জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে শিগগিরই গোটা ইউরোপজুড়ে হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিলের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংকট উপেক্ষিত
বর্তমান এই পরিস্থিতিকে এ যাবৎকালের অন্যতম বড় ও ভয়ংকর জ্বালানি সংকট হিসেবে আখ্যায়িত করেছে আইইএ। সংস্থাটি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেছে, ইউরোপের এভিয়েশন খাতের জ্বালানি ঘাটতি নিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যমে যেভাবে ফলাও করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে, তার তুলনায় এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দরিদ্র এবং উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর নিদারুণ জ্বালানি ও বেঁচে থাকার সংকট নিয়ে সেভাবে কোনো খবরই সামনে আসছে না।