মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত অষ্টম দিনে পদার্পণ করেছে। উত্তেজনার পারদ চরমে পৌঁছেছে যখন যুক্তরাজ্যের গ্লুচেস্টারশায়ারে অবস্থিত আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিতে অবতরণ করেছে মার্কিন বিমানবাহিনীর বিধ্বংসী বি-১ ল্যান্সার সুপারসনিক বোমারু বিমান। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মোতায়েন ইরান লক্ষ্য করে আসন্ন বড় ধরনের মার্কিন মিশনের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার সকালের মধ্যে চারটি বি-১ ল্যান্সার বোমারু বিমান ব্রিটিশ ঘাঁটিতে অবতরণ করে। ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান স্যার রিচার্ড নাইটন জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এই ঘাঁটি থেকে ইরান লক্ষ্য করে মার্কিন মিশন পরিচালিত হতে পারে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “ইরানে হামলার তীব্রতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করা হবে এবং আরও বেশি ফাইটার স্কোয়াড্রন ও বোমারু বিমান এই অভিযানে অংশ নেবে।”
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার ইতোমধ্যে মার্কিন বাহিনীকে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি (ফেয়ারফোর্ড ও ডিয়েগো গার্সিয়া) ব্যবহারের সীমিত অনুমতি প্রদান করেছেন। ডাউনিং স্ট্রিটের ভাষ্যমতে, এই অনুমতি শুধুমাত্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ইরানের কাছে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না।” ট্রাম্পের এই হুঙ্কারের পর ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা বাইরের কোনো শক্তির হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না এবং দেশটির ভাগ্য কেবল ইরানি জনগণই নির্ধারণ করবে।
এদিকে, এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিরোধী দলীয় নেত্রী কেমি ব্যাডেনচ সরকারের এই বিলম্বিত সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছেন, এর ফলে মিত্র দেশগুলো ব্রিটেনের ওপর আস্থা হারাচ্ছে। অন্যদিকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি জানিয়েছেন, ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে সরাসরি হামলার আইনগত প্রস্তুতি রয়েছে যুক্তরাজ্যের। বর্তমানে ব্রিটিশ রণতরী এইচএমএস ড্রাগন ভূমধ্যসাগরের পথে রয়েছে।
যুদ্ধকবলিত অঞ্চল থেকে ব্রিটিশ নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জোরালো করা হয়েছে। পররাষ্ট্র দফতরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার ব্রিটিশ নাগরিক সহায়তা চেয়ে নিবন্ধন করেছেন। ওমানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে চার্টার্ড ফ্লাইটে নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দুবাইয়ের ওপর দিয়ে ফ্লাইট চলাচল সীমিত পর্যায়ে চালু হলেও পরিস্থিতি থমথমে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ‘বিপজ্জনক’ সামরিক কৌশল এবং ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।