সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে গত মাসের ড্রোন হামলার ভয়াবহতা নিয়ে এবার বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে জানা গেছে, ইতিপূর্বে প্রকাশিত তথ্যের চেয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল বহুগুণ বেশি, যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নিরাপত্তা বলয়কে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
গত ৩ মার্চ গভীর রাতে রিয়াদের কঠোর সুরক্ষিত কূটনৈতিক এলাকায় এই হামলা চালায় ইরান। কর্মকর্তারা জানান, হামলাটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। প্রথম একটি ইরানি ড্রোন দূতাবাসের সুরক্ষিত দেয়াল ভেদ করে ভেতরে গর্ত তৈরি করে। এর ঠিক এক মিনিটের মাথায় দ্বিতীয় আরেকটি ড্রোন প্রথমটির তৈরি করা সেই গর্ত দিয়ে ভেতরে ঢুকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটায়। সামরিক ভাষায় একে বলা হয় ‘ডাবল ট্যাপ’ অ্যাটাক, যা লক্ষ্যবস্তুকে পুরোপুরি ধ্বংস নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হয়।
হামলায় দূতাবাসের একটি বিশেষ অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে দিনের বেলায় কয়েকশ কর্মী কাজ করেন।
গোয়েন্দা দপ্তরে আঘাত: হামলার শিকার হওয়া অংশের মধ্যে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনও ছিল। ভবনের অন্তত তিনটি তলা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে যা আর পুনরুদ্ধারযোগ্য নয়।
বাসভবন লক্ষ্য: ধারণা করা হচ্ছে, একটি ড্রোন সৌদি আরবে নিযুক্ত সর্বোচ্চ পদস্থ মার্কিন কূটনীতিকের বাসভবন লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল, যা দূতাবাস থেকে মাত্র কয়েকশ ফুট দূরে অবস্থিত।
প্রিস্কুলে ধ্বংসাবশেষ: ভূপাতিত করা ড্রোনগুলোর ধ্বংসাবশেষ একটি প্রিস্কুলের কাছেও পড়তে দেখা গেছে।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় শুরুতে এই ঘটনাকে ‘সীমিত আগুন ও সামান্য ক্ষয়ক্ষতি’ বলে প্রচার করলেও মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, হামলার পর দূতাবাসে প্রায় অর্ধদিন ধরে আগুন জ্বলতে থাকে। সাবেক সিআইএ সন্ত্রাসবিরোধী প্রধান বার্নার্ড হাডসন বলেন, “ইরান শত শত মাইল দূর থেকে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষের দূতাবাসে আঘাত করতে সক্ষম হয়েছে—এর মানে তারা শহরের যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, মার্কিন ঘাঁটি ও দূতাবাসগুলোর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে বর্তমানে ‘পূর্ণ অন্ধকার’ বা তথ্য গোপন রাখা হচ্ছে।
রিয়াদ দূতাবাসের এই হামলার কয়েক সপ্তাহ পরই মার্চের শেষ দিকে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে পুনরায় হামলা চালায় ইরান। সেখানে একটি রাডার নজরদারি বিমান ও জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই হামলায় অন্তত এক ডজন মার্কিন সেনা আহত হন, যাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বাগদাদ, দুবাই, কুয়েত সিটি এবং রিয়াদের মতো সুরক্ষিত শহরগুলোতে মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরান ও তাদের মিত্ররা নজিরবিহীন হামলা চালিয়েছে। যদিও এসব হামলায় কোনো মার্কিন নাগরিক নিহত হয়নি, তবে কয়েক বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে সৌদি আরবে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর। তাদের হোটেল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রিয়াদের যে কূটনৈতিক এলাকা প্রবাসীদের জন্য ‘সেফ জোন’ হিসেবে পরিচিত ছিল, ইরানি ড্রোনের এই নিখুঁত নিশানার পর সেই নিরাপত্তা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।