দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এবং বহুল আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারি ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি’ মামলার তদন্ত দীর্ঘ ১০ বছর পর অবশেষে চূড়ান্ত আলোর মুখ দেখছে। সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ দেশি-বিদেশি মোট ৬৪ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করে মামলার খসড়া অভিযোগপত্র (চার্জশিট) ও ডকেট প্রস্তুত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। চূড়ান্ত আইনি মতামতের জন্য এই ১শ ৫০ পৃষ্ঠার খসড়া চার্জশিট এবং প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার প্রমাণক নথিপত্র গত ১ এপ্রিল অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত এই চার্জশিট আদালতে উপস্থাপন করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা গেলে তা দেশের আর্থিক খাতে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ও কঠোর বার্তা দেবে।
সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুইফট পেমেন্ট সিস্টেমে ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে নিউইর্য়কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরির এই ঘটনায় বাংলাদেশসহ মোট সাতটি দেশের অপরাধী চক্র জড়িত ছিল।
অভিযুক্ত ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভৌগোলিক তালিকা:
ফিলিপাইন: ৩৬ জন (যার মধ্যে আরসিবিসি ব্যাংকের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মায়া দিগুতিও রয়েছেন)
বাংলাদেশ: ১০ জন (সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ শীর্ষ কর্মকর্তা)
শ্রীলঙ্কা: ৮ জন
ভারত: ৪ জন (প্রিথাম রেড্ডি, সুধীন্দ্র আথ্রেশ, নীলাভান্নান মাদুক্কুর আনন্দন ও রাশে আস্থানা)
চীন: ৩ জন
নর্থ কোরিয়া: ২ জন
জাপান: ১ জন
তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় ১০ জন আসামির তালিকায় সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টরা রয়েছেন। অভিযুক্তরা হলেন— আনিস এ খান, কে এম আব্দুল ওয়াদুদ, শুভংকর সাহা, রেজাউল করিম, জোবায়ের বিন হুদা, এ এফ এম আসাদুজ্জামান, মেজবাউল হক, আবুল কাসেম এবং মো. সুলতান মাসুদ আহমেদ।
মামলার অন্যতম তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ফরহাদ কবির (যিনি ২০২৫ সালের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন) মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের সহায়তায় নর্থ কোরিয়ার হ্যাকার পার্ক জিন হিয়ক এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন ‘লাজারাস গ্রুপকে’ এই চুরির মূল হ্যাকার হিসেবে শনাক্ত করেন। একই সাথে ফিলিপাইনের আরসিবিসি (RCBC) ব্যাংকের মাধ্যমে পাচার হওয়া ৮১ মিলিয়ন ডলারের গতিপথও সফলভাবে উন্মোচন করেন তারা।
এই মামলার সাত বছরের দীর্ঘ তদন্তকালে একাধিকবার তদন্ত কর্মকর্তাদের ওপর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। মামলার প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বর্তমান অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খান (যিনি ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন) জানান, চুরির ৪০ দিন পর মামলা হওয়ায় প্রকৃত ‘ক্রাইম সিন’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এর পরও আলামত সংগ্রহ ও ফিলিপাইন-জাপান থেকে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (MLAR) প্রক্রিয়ায় তথ্য এনে চুরির টাকার একটি অংশ ফেরত আনতে সক্ষম হন তারা।
তবে তদন্ত চলাকালে বাংলাদেশি প্রভাবশালীদের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়ার জন্য তীব্র চাপ দেওয়া হয়। ২০২০ সালের ১ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনফারেন্স রুমে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের উপস্থিতিতে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে বাংলাদেশি অপরাধীদের নাম বাদ দিয়ে চার্জশিট দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এতে রাজি না হওয়ায় রায়হান উদ্দিন খান এবং মামলা তদারককারী কর্মকর্তা মোস্তফা কামালকে সভা থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২২ সালে সিআইডির তৎকালীন প্রধান মোহাম্মাদ আলীও বাংলাদেশি আসামিদের বাদ দিতে চাপ দেন এবং গোপনীয় ফরেনসিক রিপোর্ট একটি বিদেশি ল ফার্মের কাছে পাচার করেন। চাপের মুখে মাথা নত না করায় ২০২৩ সালের আগস্টে রায়হান উদ্দিন খানকে তদন্ত থেকে সরিয়ে জয়পুরহাটে ও পরে এন্টি টেররিজম ইউনিটে (এটিইউ) বদলি করা হয়। পরবর্তী সময়ে তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন যথাক্রমে অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ ইয়াসিন এবং মং থোয়াই মারমা।
বিগত দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ভেঙে গত বছর ১১ মার্চ সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের ‘পর্যালোচনা কমিটি’ গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। এই কমিটির প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ও সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহর বিশেষ নির্দেশনায় তদন্ত দল নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে শতভাগ তথ্য-প্রমাণ নিশ্চিত করে মামলাটি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে আসে। কমিটির এক কর্মকর্তা জানান, দেশীয় আসামিদের নাম কাটার সব ধরনের অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে খসড়া চার্জশিট তৈরি করা হয়েছে।
বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন জানিয়েছেন, তদন্ত শতভাগ নিখুঁতভাবে শেষ পর্যায়ে আনা হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে আইনি মতামত পাওয়ামাত্রই আনুষ্ঠানিকভাবে এই চূড়ান্ত চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হবে, যার মাধ্যমে ১০ বছর পর অবসান ঘটবে দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম এই ডিজিটাল চুরির তদন্ত পর্বের।