পেন্টাগনের আশপাশে গভীর রাতে হঠাৎ পিৎজা সরবরাহের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির খবর দেখে মার্কিন নাগরিক স্টু একটি অভিনব বাজি ধরে বসেন। তাঁর বাজির বিষয় ছিল—১লা মার্চের মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ক্ষমতাচ্যুত হবেন কি না! স্টুর মতো হাজারো আমেরিকানের এই কৌতূহলকে পুঁজি করে দেশটিতে এখন রমরমা ব্যবসা করছে ‘কালশি’ বা ‘পলিমার্কেট’-এর মতো প্রেডিকশন মার্কেট বা আগাম পূর্বাভাসের অ্যাপগুলো। খেলাধুলা বা সাধারণ নির্বাচনের গণ্ডি পেরিয়ে এসব প্ল্যাটফর্মে এখন যুদ্ধ, রাষ্ট্রপ্রধানদের মৃত্যু কিংবা বৈশ্বিক সামরিক সংঘাতের মতো চরম স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে দেদারসে বাজি ধরা হচ্ছে, যার মোট লেনদেনের পরিমাণ ইতোমধ্যেই ৪৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টিকে নিছক বিনোদন বা আর্থিক বিনিয়োগ মনে হলেও, এর নেপথ্যে লুকিয়ে আছে গভীর নৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার শঙ্কা। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নীতিমালা অনুযায়ী যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ বা হত্যাকাণ্ড নিয়ে জুয়া খেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু কোটি কোটি টাকার এই উন্মাদনা কোনো নিয়মকানুনের তোয়াক্কাই করছে না। সমালোচকরা বলছেন, এ ধরনের বাজি অনৈতিক যুদ্ধ-মুনাফার সুযোগ তৈরি করছে এবং ভেতরের গোপন তথ্য (ইনসাইডার ট্রেডিং) ব্যবহার করে দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করছে। উদাহরণস্বরূপ, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটকের সরকারি ঘোষণার ঠিক আগেই পলিমার্কেটে এক জুয়াড়ির প্রায় ৫ লাখ ডলার জিতে নেওয়ার ঘটনাটি মার্কিন প্রশাসনের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। এছাড়া শুধু একটি প্ল্যাটফর্মেই ইরান যুদ্ধ নিয়ে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি লেনদেন হয়েছে।
এই অভাবনীয় জনপ্রিয়তার সাথেই শুরু হয়েছে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে এক চরম আইনি লড়াই ও কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব। প্রথাগত জুয়া বা গেমিং প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো এই অ্যাপগুলো নিজেরা সরাসরি কোনো বাজির দর নির্ধারণ করে না; বরং এরা অনেকটা স্টক এক্সচেঞ্জের মতো কাজ করে, যেখানে ব্যবহারকারীরা ‘ইভেন্ট কন্ট্রাক্ট’-এর মাধ্যমে একে অপরের বিপক্ষে বাজি ধরেন। এই কাঠামোগত ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে তারা নিজেদের সাধারণ জুয়া প্রতিষ্ঠানের বদলে ‘আর্থিক এক্সচেঞ্জ’ হিসেবে দাবি করছে, যাতে জুয়া ব্যবসার কড়া নিয়ম ও কর এড়ানো যায়। ফলশ্রুতিতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘সিএফটিসি’ এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের জুয়া নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে এদের নিয়ন্ত্রণভার নিয়ে ডজনখানেক আইনি লড়াই চলছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে এই জুয়া বাজারগুলোর ভবিষ্যৎও এখন নতুন মোড় নিচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর এসব প্ল্যাটফর্মের প্রতি মার্কিন প্রশাসনের নীতি অনেকটাই শিথিল হয়েছে। সিএফটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান মাইকেল সেলিগ এই ইভেন্ট কন্ট্রাক্টগুলোকে ‘বৈধ অর্থনৈতিক কার্যক্রম’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এর পক্ষেই সাফাই গেয়েছেন। তবে তীব্র সামাজিক ও আইনি চাপের মুখে পড়ে কালশি সম্প্রতি খামেনিকে ঘিরে তাদের ৫৪ মিলিয়ন ডলারের বাজারটি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে এবং ভেতরের তথ্য ব্যবহারের অভিযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিয়েছে। স্টুর মতো অনেক ব্যবহারকারী শেষমেশ তাদের বাজির অর্থ ফেরত পেলেও, তাদের সাফ কথা—প্রযুক্তিগতভাবে এসব প্রতিষ্ঠান বিষয়টিকে গালভরা ‘কন্ট্রাক্ট ট্রেডিং’ নাম দিলেও, দিনশেষে এটি স্রেফ জুয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।