• শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ১১:৪০ অপরাহ্ন

কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মস্কো সফর

Reporter Name / ৫ Time View
Update : শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করতে এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে আগামী রবিবার রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়বেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিন দিনব্যাপী এই সরকারি সফরটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন দেশি-বিদেশি কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। দীর্ঘ ১৭ বছর বিরোধী দলে থাকার পর গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। নতুন এই সরকার গঠিত হওয়ার পর মস্কোর সঙ্গে এটিই হতে যাচ্ছে ঢাকার প্রথম কোনো উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দ্বিপক্ষীয় সফর। এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার দীর্ঘদিনের বন্ধু রাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজেদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বৈচিত্র্যময় পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন ঘটাতে চায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির বর্তমান জটিল প্রেক্ষাপটে এই ধরনের দ্বিপক্ষীয় সফর বাংলাদেশের নিজস্ব উন্নয়ন ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মহল।

বিগত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশের নতুন সরকার তাদের বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যাপক সক্রিয়তা প্রদর্শন করে আসছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে प्रभाव বিস্তারকারী অন্যতম প্রধান পরাশক্তি ভারত, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক জোরদারে ঢাকা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে কাজ করেছে। নতুন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা এরই মধ্যে এই রাষ্ট্রগুলোর সাথে উচ্চপর্যায়ের একাধিক বৈঠক সম্পন্ন করেছেন। এই ধারাবাহিকতায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের আসন্ন মস্কো সফরটিকে পূর্ববর্তী সব কূটনৈতিক প্রচেষ্টার একটি সফল পরিপূরক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ঢাকা স্পষ্টভাবে বিশ্ববাসীকে এই বার্তা দিতে চায় যে, তারা কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের দিকে ঝুঁকে না পড়ে বরং সমস্ত বৈশ্বিক অংশীদার ও প্রধান পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে একযোগে গঠনমূলক, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বর্তমান বৈশ্বিক परिस्थितीत যখন পরাশক্তিগুলোর মধ্যে নানা ধরনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা চলছে, তখন বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এমন একমুখী বা ভারসাম্যহীন অবস্থান এড়ানো এবং সবার সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করা অত্যন্ত বড় চ্যালেঞ্জ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তিন দিনের এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত ঠাসা সূচির সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান রাশিয়ার উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের সাথে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন। সফরের মূল আকর্ষণ হিসেবে আগামী সোমবার রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে এক আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন তিনি। এই বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা দ্বিপক্ষীয় বিষয়ের পাশাপাশি সমসাময়িক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বহুপক্ষীয় ফোরামগুলোতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান রাশিয়ার স্থানীয় প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোতে সাক্ষাৎকার দেবেন, যেখানে তিনি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নতুন সরকারের অর্থনৈতিক এজেন্ডা এবং বৈশ্বিক নীতি নিয়ে আলোচনা করবেন। এই সফরের আন্তর্জাতিক তাৎপর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে একটি বিশেষ দিক— পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) আসন্ন অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এই শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক পদের কারণে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরের গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নজরুল ইসলাম এই সফরটিকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন। রাশিয়ার মস্কো থেকে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর এটাই ঢাকা ও মস্কোর মধ্যে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক স্তরের প্রথম কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ। এই শীর্ষ বৈঠক থেকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা এবং ইতিবাচক ফলাফল আসবে বলে আমরা যৌথভাবে আশা করছি। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিশ্ব রাজনীতিতে চলমান দ্রুত এবং অভূতপূর্ব ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের এই সময়ে রাশিয়ার মতো একটি ঐতিহ্যবাহী বন্ধু রাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করার ক্ষেত্রে এই সফরটি অত্যন্ত দূরদর্শী এবং ভবিষ্যৎমুখী ভূমিকা পালন করবে। বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যেকার সম্পর্ক কয়েক দশকের পুরনো এবং ১৯৭১ সালের মহান যুদ্ধের সময় থেকেই এই সম্পর্কের ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত। শক্তি, বাণিজ্য, কৃষি, শিক্ষা, মানবসম্পদ এবং প্রতিরক্ষা খাতের মতো বহুবিধ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে এই দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা বিদ্যমান রয়েছে।

বাংলাদেশ ও রাশিয়ার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান স্তম্ভটি হলো জ্বালানি খাত, যার অনন্য প্রতীক পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম পারমাণবিক শক্তি প্রকল্প, যা রাশিয়ার কারিগরি, প্রযুক্তিগত এবং বিশাল আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। রূপপুর প্রকল্পকে দুই দেশের মধ্যকার অনন্য সহযোগিতার এক ফ্ল্যাগশিপ প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। রাষ্ট্রদূত মো. নজরুল ইসলাম এই প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে জানান, রাশিয়ার সার্বিক সহায়তায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ অত্যন্ত সুচারুভাবে ও পরিকল্পিত উপায়ে এগিয়ে চলছে। প্রথম ইউনিটের কাজের পাশাপাশি দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও পুরোদমে চলছে এবং নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী এক বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের কমিশনিং বা পরীক্ষামূলক উৎপাদন সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই বিশাল প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে, যা নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার।

জ্বালানি খাতের বাইরেও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার পরিধি আরও ব্যাপকভাবে বাড়াতে অত্যন্ত আগ্রহী ঢাকা। বিশেষ করে বাংলাদেশের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দেশের কৃষি খাতের উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতে রাশিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ প্রতি বছর রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য, বিশেষ করে উচ্চমানের গম এবং কৃষিকাজের জন্য অপরিহার্য বিভিন্ন রাসায়নিক সার আমদানি করে থাকে। রাষ্ট্রদূত নজরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ করেন, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে অর্থনৈতিক খাতে আরও অনেক বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ তার ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে রাশিয়াকে খাদ্যশস্য এবং सারের একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও পরীক্ষিত উৎস হিসেবে বিবেচনা করে। বর্তমান বিশ্ববাজারে খাদ্য এবং সারের সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তার মধ্যে রাশিয়ার কাছ থেকে এসব পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি। তাই আসন্ন বৈঠকে এই আমদানি প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও গতিশীল করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে।

কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরের মাধ্যমে কেবল ঐতিহ্যবাহী খাতগুলোই নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার আরও কিছু নতুন এবং উদীয়মান ক্ষেত্র উন্মোচিত হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি স্থানান্তর, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা, ওষুধ শিল্প বা ফার্মাসিউটিক্যালস, মানবসম্পদ রপ্তানি এবং যৌথ বিনিয়োগের মতো বিষয়গুলো। বিশেষ করে বাংলাদেশের মানসম্মত ওষুধ রাশিয়ার বাজারে রপ্তানি করার বড় সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও বৃদ্ধি করার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে। মানবসম্পদ বা শ্রম অভিবাসনের ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা দুই দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে পারে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা ও বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ঠিক রাখার বিষয়েও দুই দেশ নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি বিনিময় করবে।

পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য এই সফরটি অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং সময়োপযোগী একটি সিদ্ধান্ত। বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাকে সচল রাখতে পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে সুষম সম্পর্ক বজায় রাখার কোনো বিকল্প নেই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের এই তিন দিনের মস্কো সফর কেবল রাশিয়ার সাথে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে পুনরুজ্জীবিতই করবে না, বরং বাংলাদেশের জাতীয় ও কৌশলগত স্বার্থ সমুন্নত রেখে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং বৈচিত্র্যময় কূটনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন সরকারের দূরদর্শিতাকে আরও একবার প্রমাণ করবে। বেইজিং, নতুন দিল্লি কিংবা ওয়াশিংটনের পাশাপাশি মস্কোর সাথে এই রাজনৈতিক সখ্যতা ঢাকার কূটনৈতিক ঝুড়িকে আরও সমৃদ্ধ করবে এবং একটি উন্নয়নকামী রাষ্ট্র হিসেবে বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category