• বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৬ অপরাহ্ন
Headline
মতুয়া চমক: ভোটের অংকে সংরক্ষিত আসনে এমপি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: ৫৬ হাজার কোটির দায় কেন জনগণের কাঁধে? লোগো নকল, দাম আকাশছোঁয়া: সংসদের কেনাকাটায় এ কোন জাদুকরি হিসাব? তীব্র গরমে হঠাৎ ঘাম বন্ধ? হিট স্ট্রোক নয় তো! অবশেষে বোনদের পথ ধরে হজে যাচ্ছেন চম্পা অনুমতি ছাড়া ভিডিও করলে দ্রুত বিচার আইনে ব্যবস্থা: তথ্যমন্ত্রী ইরানের তেল বাণিজ্য সম্পূর্ণ অচল করার কড়ার হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি কি কৌশল না ইসলামাবাদের মধ্যস্থতা ‘অবৈধ যুদ্ধ’ আড়াল করতেই হুমকি: ইরানি-মার্কিন কংগ্রেসওম্যান ইয়াসামিন আনসারি বিশ্বমঞ্চে ‘শান্তিদূত’ পাকিস্তান: আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার আড়ালে ধুঁকছে ঘরোয়া রাজনীতি

চালক যখন তেলের লাইনে: গন্তব্যে পৌঁছানোর এক অন্তহীন যুদ্ধ

Reporter Name / ৫ Time View
Update : বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬

সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস। অফিস শেষে ঘরে ফেরার তাড়া সবার চোখেমুখে। ঘড়িতে তখন বিকেল সাড়ে ৫টা। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র শাহবাগ মোড়ে বিভিন্ন গন্তব্যের অসংখ্য মানুষ বাসের অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু দীর্ঘ এই অপেক্ষার বিপরীতে সড়কে গণপরিবহনের উপস্থিতি একেবারেই নগণ্য। মাঝে মাঝে দুই-একটি বাস এলেও সেগুলো যাত্রীতে কানায় কানায় পূর্ণ, তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ফলে দাঁড়িয়ে থাকা বিপুলসংখ্যক যাত্রীর মধ্যে জীবনবাজি রেখে মাত্র কয়েকজন কোনোমতে বাসে ঝুলে উঠতে পারলেও, অধিকাংশকেই বিফল হয়ে হতাশ মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।

এটি কেবল শাহবাগ মোড়ের চিত্র নয়, বরং বর্তমানে পুরো ঢাকা শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। গত মার্চ মাস থেকে দেশজুড়ে শুরু হওয়া তীব্র জ্বালানি সংকটের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে রাজধানীর পরিবহন খাতে। পাম্পগুলোতে ডিজেলের জন্য দীর্ঘ লাইন এবং চাহিদামতো পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় ঢাকার সড়কগুলো থেকে ইতোমধ্যেই প্রায় ২০ শতাংশ বাস উধাও হয়ে গেছে। এর ফলে দিনের ব্যস্ত সময়ে বা ‘পিক আওয়ারে’ সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা।


দৃশ্যপট শাহবাগ ও বাংলামোটর: দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর

শাহবাগে বাসে উঠতে না পেরে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ বক্সের পাশে ক্লান্ত শরীরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাসলিমা স্বর্ণা নামে এক যাত্রী। দীর্ঘ অপেক্ষার ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “বাসে যে পরিমাণ ভিড়, তাতে ওঠার কোনো উপায়ই নেই। ধাক্কাধাক্কি করে উঠতে না পেরে এই বাসটিও মিস করলাম। পরের বাসের জন্য আরও কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে কে জানে! বেশ কয়েক দিন ধরেই রাস্তায় বাসের সংখ্যা অনেক কম দেখছি।”

তাসলিমা আরও যোগ করেন, “আগে যেখানে একই সিরিয়ালে বিভিন্ন কোম্পানির ৫-৭টি বাস একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিত, এখন সেখানে বড়জোর ২-৩টি বাস দেখা যায়। কখনো কখনো মোড়ে মাত্র একটি বাস দাঁড়িয়ে থাকে। হঠাৎ করেই গণপরিবহন কমে যাওয়ায় আমাদের মতো সাধারণ যাত্রীদের, বিশেষ করে নারীদের দীর্ঘক্ষণ বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে এবং চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।”

একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বাংলামোটর মোড়ে গিয়েও দেখা যায় একই চিত্র। শাহবাগ থেকে আসা লেনে হাতেগোনা মাত্র ৮-১০টি বাস চলাচল করছে। রাস্তায় কিছু ব্যক্তিগত গাড়ি (প্রাইভেট কার) ও মোটরসাইকেলের উপস্থিতি থাকলেও, সড়কের বড় একটি অংশই প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে এই মোড়ে বাসের দীর্ঘ জট লেগে থাকার কথা।


চালক ও মালিকদের অসহায়ত্ব: তেলের লাইনেই কাটছে দিনের অর্ধেক

বাস উধাও হওয়ার নেপথ্যের কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায় পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের অসহায়ত্বের কথা। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাম্প থেকে ডিজেল সংগ্রহ করতেই চালকদের দিনের বড় একটি অংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। তেলের লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার কারণে প্রতিটি বাসের ট্রিপ সংখ্যা কমে গেছে।

ঢাকার গুলিস্তান থেকে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাট রুটে চলাচল করা ‘শুভযাত্রা পরিবহন’-এর একজন বাসচালক বিল্লাল হোসেন। নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “তেলের জন্য আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। গাড়ির তেল নিতেই দিনে ৩-৪ ঘণ্টা সময় চলে যায় পাম্পের লাইনে। এই সময়ে অনায়াসেই অন্তত একটি ট্রিপ দেওয়া সম্ভব ছিল, কিন্তু সেটি আমরা পারছি না। তেলের লাইনে বসে থাকলে তো আর যাত্রীর ভাড়া জুটবে না, দিন শেষে মালিকের জমার টাকা আর নিজেদের পেট চালানোই এখন দায় হয়ে পড়েছে।”

রাজধানীর পোস্তগোলা-মালিবাগ-মধ্যবাড্ডা-দিয়াবাড়ি রুটে চলাচলকারী জনপ্রিয় বাসসেবা ‘রাইদা এন্টারপ্রাইজ’। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মকবুল হোসেন পাটোয়ারী তেলের এই রেশনিং পদ্ধতি নিয়ে চরম হতাশা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “তেল সংকটের কথা আর কী বলব! আগে আমরা একবারে একটি গাড়িতে ৫ হাজার টাকার তেল নিতে পারতাম, যা দিয়ে সারাদিনে অন্তত ৩টি ট্রিপ দেওয়া যেত। কিন্তু এখন কোনো পাম্পই একবারে এত তেল দিতে চায় না। এখন ৫ হাজার টাকার তেল নিতে হলে গাড়ি নিয়ে অন্তত দুটি পাম্পে ঘুরতে হয়। পাম্প মালিকরা ৩০০০ বা ৩৫০০ টাকার বেশি তেল দিতে নারাজ। এই সীমিত তেল দিয়ে একটি বাস বড়জোর ২টি ট্রিপ দিতে পারে। ফলে প্রতিটি বাসের দৈনিক একটি করে ট্রিপ কমে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যার ওপর।”


মালিক সমিতির ভাষ্য: স্থবিরতার নেপথ্যে

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম জানান, ঢাকা মহানগরী ও এর আশপাশের শহরতলীতে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার বাস চলাচল করে। কিন্তু জ্বালানি তেলের এই তীব্র সংকটের কারণে বর্তমানে এর অন্তত ২০ শতাংশ বাস রাস্তায় নামতে পারছে না।

তিনি বলেন, “সড়কে ৪ হাজার বাসের জায়গায় যদি ৮০০ বাস হঠাৎ করে কমে যায়, তবে সড়কে গাড়ির সংখ্যা কম থাকাটাই স্বাভাবিক। তেল সংকটের কারণেই সড়কে গাড়ি কম দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রী ভোগান্তিতে পড়ছেন এবং নিরুপায় হয়ে গাদাগাদি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাসে উঠছেন। চালকরা তেল খুঁজতেই যদি দিনের অর্ধেক সময় পার করে দেন, তাহলে গাড়ি চলবে কখন?”


বিশেষজ্ঞদের চোখে আপৎকালীন সমাধান: গণপরিবহনে অগ্রাধিকার

এই চরম সংকটকালীন সময়ে পরিবহন খাত সচল রাখতে নীতিগত পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও প্রখ্যাত যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে গণপরিবহনকে সবার আগে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তিনি বলেন, “জ্বালানি সংকটের খবরে ব্যক্তিগত গাড়ির চালকরা ‘প্যানিক বায়িং’ (আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনা) করছেন। কিন্তু বাসের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন; তাদের প্রতিদিন হাজার হাজার টাকার তেল লাগে জীবনিকা নির্বাহ ও সেবা প্রদানের জন্য। সুতরাং পাম্পগুলোতে বাসকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তেল কিনতেই যদি ২-৩ ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়, তবে জ্যামের এই শহরে গণপরিবহন সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবেই।”

আপৎকালীন একটি চমৎকার সমাধানের পথও দেখিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি পরামর্শ দেন, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেক বাস দিনের বেলায় অলস পড়ে থাকে। এই সংকটকালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সেই অলস বাসগুলোকে যদি সাময়িকভাবে সড়কে নামানো যায়, তবে গণপরিবহন সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে এবং সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি কিছুটা হলেও লাঘব হবে।


দীর্ঘমেয়াদি ভিশন: ইভি (EV) ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার এখনই সময়

জ্বালানি তেলের ওপর এই মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যে যেকোনো মুহূর্তে পুরো দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অচল করে দিতে পারে, চলমান এই সংকট তারই প্রমাণ। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা তাই দ্রুত ইলেকট্রিক ভেহিকেল বা বৈদ্যুতিক যানের (ইভি) দিকে নজর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।

অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, “ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারকে এখন থেকেই ইলেকট্রিক ভেহিকেলের জন্য জোরালো প্রস্তুতি নিতে হবে। সরকারের নীতিমালায় ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ৩০ শতাংশ যানবাহন বিদ্যুতায়নের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। কিন্তু শুধু বিদেশ থেকে ইলেকট্রিক বাস কিনে আনলেই সমাধান হবে না, বরং এর জন্য পুরো একটি ‘ইকোসিস্টেম’ বা সমন্বিত পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।”

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “ইলেকট্রিক বাস পরিচালনার জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন হাই-ভোল্টেজ সরঞ্জাম, বিশেষায়িত ওয়ার্কশপ, দক্ষ মেকানিক এবং পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশনের মতো অবকাঠামো অপরিহার্য। প্রচলিত মেকানিক দিয়ে ইলেকট্রিক বাস মেরামত সম্ভব নয়। এর জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সেটআপ প্রয়োজন। এসব প্রস্তুতি ছাড়া শুধু বাস রাস্তায় নামালে তা টেকসই হবে না। তাই ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে নীতিমালার খসড়া নিয়ে বসে না থেকে এখনই মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করা জরুরি।”


জ্বালানি সংকটের কারণে বর্তমানে রাজধানীতে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা কেবল পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে মানুষের কর্মঘণ্টা, উৎপাদনশীলতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় সবাই গণপরিবহনের দিকে ঝুঁকছেন, কিন্তু সেখানে বাসের সংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণে সরকারকে এখনই দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করতে হবে। একদিকে স্বল্পমেয়াদে ফুয়েল স্টেশনগুলোতে বাসের জন্য আলাদা লেন বা অগ্রাধিকারের ব্যবস্থা করতে হবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যুচ্চালিত বাসের ইকোসিস্টেম নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ঢাকার মতো মেগাসিটিকে সচল রাখতে হলে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। নতুবা এমন সংকট ভবিষ্যতেও বারবার ফিরে আসবে, আর চরম মূল্য চোকাতে হবে সাধারণ যাত্রীদের।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category