• বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ০১:০৮ অপরাহ্ন
Headline
তেহরানের কৌশলগত বিজয় ও পরাশক্তির অহংকার চূর্ণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ১৪ দফা যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর মহাতারকার অফ-ফর্ম ও দীর্ঘ খরা: কঙ্গোর বিপক্ষে পর্তুগালের পয়েন্ট হারানোর নেপথ্যে রোনালদো জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সরবরাহ হ্রাস: হুমকিতে পরিবার পরিকল্পনা ১০ বছর পর রিজার্ভ চুরির খসড়া চার্জশিট: ড. আতিউরসহ অভিযুক্ত ৬৪ পাচারের আট লাখ কোটি টাকা ফেরানোর জটিল সমীকরণ চীনে ১২ হাজার ডিগ্রি বাতিল, অগ্রাধিকার পাচ্ছে এআই শিক্ষা বার্ধক্য বুড়ো বয়সে নয়- শুরু হয় আজ: সাতটি সতর্কবার্তা রেলযাত্রায় আসছে বৈদ্যুতিক ট্রেন, মেগা সেতুসহ মহাসড়কে এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিডের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর শুভেন্দুর ‘ডিপোর্ট’ নীতি মানবাধিকারের লঙ্ঘন: এইচআরডব্লিউ

ট্রাম্পকে যুদ্ধের জালে জড়িয়ে হরমুজ প্রণালিতে ইসরায়েলের বিপজ্জনক খেলা

Reporter Name / ১৪৭ Time View
Update : বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬

দক্ষিণ পারস গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলাটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং গভীর কৌশলগত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তেল আবিবের এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য কেবল ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করা নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আমেরিকার সরাসরি অংশগ্রহণকে আরও জোরদার করা। একই সঙ্গে, এই অঞ্চলের উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের বিদ্যমান সংঘাতকে চূড়ান্ত পর্যায়ে উসকে দেওয়াও ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। হামলার পরপরই ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন যে এই অভিযান ওয়াশিংটনের সঙ্গে পূর্ণ সমন্বয় করেই চালানো হয়েছে। তবে নাটকীয়ভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভিন্ন সুর ধরেন। তিনি এই হামলার বিষয়ে নিজের সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং দ্বিতীয়বারের মতো ইসরায়েলকে অনুরোধ জানান যেন তারা ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় আঘাত না হানে। ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পরপরই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে নিশ্চিত করেন যে ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা ছিল না।

শীর্ষ নেতাদের এই পরস্পরবিরোধী এবং বিভ্রান্তিকর বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে অনেক বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি হয় ইসরায়েলের পক্ষ থেকে সাজানো আরেকটি সুনিপুণ মিথ্যা, অথবা এটি দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার একটি পূর্বপরিকল্পিত নাটক। ট্রাম্প হয়তো তাঁর এই ‘অজ্ঞতা’ প্রকাশের মাধ্যমে উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোকে বোঝাতে চেয়েছেন যে তিনি এই হামলার বিষয়ে জানতেন না, যাতে ইরান পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ওই আরব দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোয় আঘাত না হানে। এই পুরো পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি ইরানের জন্য একটি শক্তিশালী তুরুপের তাস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইসরায়েল আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতি লঙ্ঘন করে যে সংঘাতের উসকানি দিচ্ছে, আমেরিকা তাতে অন্ধের মতো জড়িয়ে পড়ছে। বর্তমান পরিস্থিতি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে, যেখানে মার্কিন জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ইসরায়েলের কৌশলগত প্রাধান্যই ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারণে বড় হয়ে উঠেছিল।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সুদূরপ্রসারী কৌশল হলো মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা জিইয়ে রাখা। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তিনি হরমুজ প্রণালিকে পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলকে বিশ্বের কাছে একটি বিকল্প জ্বালানি করিডর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। তবে এই যুদ্ধের বিস্তার এবং মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান ঘাঁটি থাকা দেশগুলোতে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়তে পারে, যা ১৯৭৩ সালের ঐতিহাসিক তেল সংকটের পরবর্তী পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেয়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, নেতানিয়াহু সম্ভবত ট্রাম্পকে এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে এই যুদ্ধের গতিপথ মূলত তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মার্কিন মেরিন জাহাজ পাঠানোর ঘটনা ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেই বিশ্ববাসীর সামনে প্রকট করে তুলেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্প কীভাবে এই যুদ্ধের জটিল জালে আটকা পড়লেন? বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প মূলত অর্থ এবং তাঁর প্রচণ্ড আত্মরতি—এই দুটি বিষয় দিয়ে চালিত হন। অত্যধিক প্রশংসা এবং স্তুতি দিয়েই ট্রাম্পকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, আর নেতানিয়াহু এই মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টি দীর্ঘকাল ধরে সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করে আসছেন। নেতানিয়াহু এবং মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ট্রাম্পকে এটা বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছেন যে ইরানের নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করতে পারলে রাষ্ট্রটি ভেঙে পড়বে এবং তারা দ্রুত আত্মসমর্পণ করবে। এর ফলে কোনো সুস্পষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা ছাড়াই আমেরিকা আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে। নিজের পেশাদার সামরিক কমান্ডারদের অভিজ্ঞ পরামর্শ উপেক্ষা করে ট্রাম্প তাঁর উগ্রবাদী প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের অবিবেচক জেদকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ট্রাম্প ও হেগসেথ একটি সাধারণ সত্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন যে শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে যুদ্ধ জেতা বা শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এটি অভিজ্ঞ সমরনায়কদের চিন্তা নয়; বরং অপেশাদার রাজনীতিকদের অপরিপক্ব ভাবনা। অভিজ্ঞ জেনারেলরা জানেন যে শক্তি দিয়ে একটি লড়াই জেতা গেলেও একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক পরিকল্পনা ছাড়া টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সঠিক লক্ষ্যের সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকলে শক্তিশালী সামরিক তৎপরতাও কেবল দীর্ঘস্থায়ী পণ্ডশ্রম হিসেবেই ইতিহাসে স্থান পায়।

আমেরিকার জন্য হরমুজ প্রণালি ব্রিটেনের সুয়েজ খাল বিপর্যয়ের মতো একটি ঐতিহাসিক ভুল হতে পারে। সুয়েজ খাল থেকে যেভাবে বিশ্বরাজনীতিতে ব্রিটেনের প্রভাব খর্ব হতে শুরু করেছিল, হরমুজও আমেরিকার জন্য একই পরিণাম বয়ে আনতে পারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট চাহিদার এক–পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন করা হয়। এমন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল রণক্ষেত্রে একজন দায়িত্বশীল বিশ্বনেতার অপ্রস্তুত বা বিভ্রান্ত থাকার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের কার্যকলাপে কেবল চরম বিভ্রান্তি এবং পরিস্থিতির পেছনে ছুটে চলার চেষ্টাই পরিলক্ষিত হচ্ছে। ট্রাম্প নির্বাচনের আগে মধ্যপ্রাচ্যের ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ শেষ করার এবং জ্বালানি তেলের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। অথচ এখন তাঁর কথাবার্তা এবং কাজের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। শুরুতে তিনি মার্কিন নৌবাহিনীকে দিয়ে তেল ট্যাংকার পাহারা দেওয়ার কথা বললেন। পরে ঝুঁকি দেখে তিনি তেল কোম্পানিগুলোকে ‘সাহস দেখিয়ে’ নিজেদের জোরে পথ চলতে বললেন।

যখন সেই কৌশলও কাজ করল না, তখন তিনি ন্যাটোর মিত্রসহ বিশ্বের বড় দেশগুলোকে অনুরোধ করলেন নিজেদের যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর জন্য। কিন্তু ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও চীনের মতো পরাশক্তিগুলো ট্রাম্পের এই প্রস্তাবে সরাসরি ‘না’ বলে দিয়েছে। এই দেশগুলো তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও আমেরিকার এজেন্ডা বাস্তবায়নের যুদ্ধে নিজেদের জড়াতে চায় না। পরিশেষে, হরমুজ প্রণালি ইরানের হাতের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। ইসরায়েল আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করে যে সংঘাতের উসকানি দিচ্ছে, আমেরিকা তাতে অন্ধের মতো জড়িয়ে পড়ছে। ইসরায়েল শুধু ইরানের পরমাণু সক্ষমতা ধ্বংস করতে চায় না; বরং তারা ইরানকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়, যেন এই অঞ্চলে তাদের কোনো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকে। একসময় হয়তো জর্জ ডব্লিউ বুশের মতো ট্রাম্পও উপলব্ধি করবেন যে তিনি এমন এক যুদ্ধের অন্ধকারে হারিয়ে গেছেন, যার গন্তব্য তাঁর অজানা। আর অন্য দেশের হয়ে এই প্রক্সি যুদ্ধের জন্য আমেরিকাকে হয়তো ভবিষ্যতে অনেক বড় চড়া মূল্য দিতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category