• সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ০৩:০৩ পূর্বাহ্ন

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বর্তমান সংঘাত: নেপথ্যের কারণ ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

Reporter Name / ৯০ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬

প্রতিবেশী দুই মুসলিম দেশ পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই বেশ জটিল। ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তানের তৎকালীন নেতৃত্ব বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও, সেই প্রত্যাশা খুব দ্রুতই হতাশায় রূপ নেয়। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক চরম তলানিতে এসে ঠেকেছে, যা প্রায়শই রূপ নিচ্ছে রক্তক্ষয়ী সীমান্ত সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি বিমান হামলায়।

এই সংঘাতের নেপথ্যে কোনো একক কারণ নেই; বরং ইতিহাস, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা শঙ্কা এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির এক জটিল সমীকরণ এর জন্য দায়ী। নিচে এই সংঘাতের প্রধান কারণগুলোর একটি বিশ্লেষণমূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

১. টিটিপি (TTP) ইস্যু এবং নিরাপত্তা শঙ্কা বর্তমান উত্তেজনার সবচেয়ে বড় কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান’ বা টিটিপি। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগান তালেবান ক্ষমতায় আসার পর টিটিপি জঙ্গিরা আফগানিস্তানের মাটিতে নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে এবং সেখান থেকেই তারা পাকিস্তানের ভেতরে একের পর এক ভয়াবহ হামলা চালাচ্ছে। আফগান সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও, পাকিস্তান নিজেদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আফগানিস্তানের ভেতরে সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে, যা আফগানদের সার্বভৌমত্বে আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

২. ঐতিহাসিক ‘ডুরান্ড লাইন’ বিতর্ক দুটি দেশের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যা ‘ডুরান্ড লাইন’ নামে পরিচিত। ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ আমলে এই সীমানা নির্ধারিত হলেও আফগানিস্তান কখনোই একে আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। পাকিস্তান এই সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু করলে আফগান বাহিনী তাতে বাধা দেয়। এই সীমানা ঘিরে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে প্রায়শই গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।

৩. আফগান শরণার্থীদের জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন গত কয়েক দশকে যুদ্ধের কারণে লাখ লাখ আফগান নাগরিক পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান সরকার বৈধ কাগজপত্রবিহীন লাখ লাখ আফগানকে জোরপূর্বক দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। তীব্র অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া আফগানিস্তানের ওপর এটি বিশাল চাপ তৈরি করেছে, যা দুই দেশের সম্পর্কে চরম তিক্ততা বাড়িয়েছে।

৪. সীমান্ত বাণিজ্য ও ট্রানজিট সংকট স্থলবেষ্টিত দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য আফগানিস্তানকে পাকিস্তানের সমুদ্রবন্দরের ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হয়। কিন্তু রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে পাকিস্তান প্রায়ই তোরখাম এবং চমন-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ক্রসিংগুলো বন্ধ করে দেয়। আফগান সরকার একে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে মনে করে।

৫. কৌশলগত সমীকরণ ও ভারতের প্রভাব পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানে নিজেদের ‘কৌশলগত গভীরতা’ (Strategic Depth) নিশ্চিত করতে চেয়েছে, যাতে ওই অঞ্চলে ভারতের প্রভাব কমানো যায়। কিন্তু আফগান তালেবান প্রমাণ করেছে যে তারা স্বাধীনভাবে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে চায়। ভারতের সাথেও তাদের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা ইসলামাবাদ ভালোভাবে নিচ্ছে না।

৬. মধ্যপ্রাচ্য সমীকরণ: ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও নতুন মাত্রার গুঞ্জন সাম্প্রতিক সময়ে এই দ্বিপাক্ষিক সংঘাতের সাথে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির একটি আপেক্ষিক সমীকরণও সামনে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে গুঞ্জন রয়েছে যে, ইরান আক্রান্ত হলে আফগান তালেবান তাদের পক্ষে কৌশলগত বা সামরিক সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান মূলত নিজেদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার তাগিদেই (টিটিপি দমন) আফগানিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এটি যুক্তরাষ্ট্রের (বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের) কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে দারুণভাবে মিলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি পাকিস্তানকে দিয়ে এই হামলা করাচ্ছে—এমনটা আক্ষরিক অর্থে পুরোপুরি সঠিক না হলেও, পাকিস্তানের এই সামরিক পদক্ষেপে তাদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকার বিষয়টি অমূলক নয়। এর মূল কারণ হলো: আফগান তালেবান যদি নিজেদের সীমান্তে পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতে মারাত্মকভাবে ব্যস্ত থাকে, তবে তাদের পক্ষে ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো ফ্রন্টে নজর দেওয়া বা সহায়তা পাঠানো সম্ভব হবে না। ফলে, পাকিস্তানের নিজস্ব সন্ত্রাসদমন অভিযান পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইরানকে চাপে রাখার’ নীতির পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে।

সারসংক্ষেপ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বর্তমান সংঘাত মূলত আস্থার অভাব এবং নিজ নিজ জাতীয় স্বার্থের দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত। তবে এর সঙ্গে যখন আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর পরোক্ষ স্বার্থ মিলে যায়, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। এই বিষয়গুলোর কোনো সম্মানজনক ও গঠনমূলক সমাধান না হলে এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category