মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এখন চরম রূপ ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের কঠোর প্রতিশোধ নিতে এবার একযোগে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতে ভয়াবহ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। শনিবার (২৮ মার্চ) এবং এর আগের দিন শুক্রবার চালানো এই ত্রিমুখী হামলায় ১২ জন মার্কিন সেনা আহত হওয়ার পাশাপাশি আমিরাতের শিল্পাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ড এবং কুয়েত বিমানবন্দরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাডার ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সৌদির মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত
শুক্রবার (২৭ মার্চ) সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে আকস্মিক আঘাত হানে ইরান। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলায় ঘাঁটিতে অবস্থানরত ১২ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ না খুললেও ‘এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস ম্যাগাজিন’ জানিয়েছে, হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি রিফুয়েলিং (জ্বালানি ভরার) বিমান এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ই-৩ সেন্ট্রি এডাব্লিউএসিএস (আকাশে নজরদারি ও কমান্ড) বিমান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এই সংঘাতে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৭৩ জন ইতোমধ্যে চিকিৎসাশেষে পুনরায় দায়িত্বে ফিরেছেন।
আমিরাতের শিল্পাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ড
অন্যদিকে, শনিবার (২৮ মার্চ) ভোরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের ছোড়া ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের আঘাতে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশ কয়েকটি হামলা সফলভাবে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে, একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর তার বিশাল ধ্বংসাবশেষ ভূপাতিত হয়ে আবুধাবির খলিফা ইকোনমিক জোনসের শিল্পাঞ্চলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। আবুধাবি সরকারের গণমাধ্যম দপ্তর জানিয়েছে, আগুন নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ কাজ করছে এবং এএফপির খবর অনুযায়ী, সেখানে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
কুয়েত বিমানবন্দরের রাডার ধ্বংস
প্রায় একই সময়ে ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘কুনা’ জানিয়েছে, দফায় দফায় চালানো এই ড্রোন হামলায় বিমানবন্দরের রাডার ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ কোনো প্রাণহানির খবর নাকচ করলেও পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই বিমানবন্দরটি বেশ কয়েকবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এর আগে গত বুধবারও এই বিমানবন্দরের একটি জ্বালানি ডিপোতে ড্রোন হামলায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল। কুয়েত সরকার এসব ধারাবাহিক হামলার জন্য সরাসরি ইরানকেই দায়ী করেছে।
প্রতিশোধের আগুন ও ইউক্রেনের সহায়তা
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে আকস্মিক বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে হত্যা করে। মূলত সেই হামলার প্রতিশোধ নিতেই ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে এই ধ্বংসাত্মক পাল্টা হামলা চালাচ্ছে তেহরান। তাদের নিক্ষেপ করা অত্যাধুনিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে মিত্র দেশগুলো।
এমন এক চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অনুরোধে উপসাগরীয় দেশগুলোকে সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছে ইউক্রেন। দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরানি ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোন মোকাবিলার যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ইউক্রেনের রয়েছে, তা কাজে লাগিয়েই তারা এখন মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের আকাশ প্রতিরক্ষায় কৌশলগত সহায়তা দিচ্ছে।