১) এক বিয়েতে গিয়ে চমকে উঠলাম। মনে হলো, কয়েক শ টিপু সুলতান কবর থেকে উঠে এসেছেন। ছেলেবুড়ো সবাই টিপু সুলতান!
গায়ে আচকান, চুড়িদার পাজামা, মাথায় পাগড়ি, কোমরে কাঠের তলোয়ার!
ভিরমি খেতে খেতে জানলাম, এটা নাকি কন্যাপক্ষের ড্রেস কোড! তবে যার যার ড্রেস তাঁকেই বানাতে হয়েছে।
একজন পরিচিত টিপু সুলতানকে পেলাম। তাঁকে মনে হচ্ছে যাত্রাপালায় নেমেছেন। তিনি খুব বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আমার ভায়রার ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে। ভদ্রলোককে ঠিকমতো চিনিও না। কিন্তু ফ্যামিলির চাপে আট হাজার টাকা খরচ করে এই ড্রেস বানাতে হয়েছে।’
আরেকদিকে দুজন টিপু সুলতান প্রায় যুদ্ধোদ্যত। কারণ একজনের তলোয়ারের খোঁচায় আরেকজনের পাজামা ফেঁসে গেছে। মান-সম্মান বরবাদ যাওয়ার অবস্থা!
২) কয়েক দিন আগে একটি কনভেনশন হলে বিভিন্ন কক্ষে কয়েকটি বিয়ে হচ্ছিল। আমি ভুল করে অন্য বিয়ের আসরে ঢুকে পড়েছিলাম। আমাকে বেশ তাজিমের সঙ্গে অভ্যর্থনা জানানো হলো। খেতে ডাকা হলো। কিন্তু পরিচিত কাউকে না দেখায় আমার সন্দেহ হলো, ভুল জায়গায় এসেছি। পরে দেখা গেল, আমার ধারণাই ঠিক। আমার দাওয়াত অন্য কক্ষের বিয়েতে। আমাকে সম্ভবত পাত্রপক্ষের কেউ ভাবা হয়েছিল।
অর্থাৎ হোস্ট তাঁর গেস্টদেরই চেনেন না। কারণ পাত্রপক্ষের সবাইকে চেনা তাঁর জন্য অসম্ভব।
অধিকাংশ বিয়েতে পাত্রপক্ষ চেনে না পাত্রীপক্ষের সবাইকে। পাত্রীপক্ষ চেনে না পাত্রপক্ষের সবাইকে। অথচ রক্তপানি করা টাকা কোরমা-পোলাও বানিয়ে এদের মুখে বানিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে!
৩) এক বিয়েতে বর কোণায় চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। তার কপালে ছোপ ছোপ রক্ত। কনে তার মাথা কোলে নিয়ে কাঁদছে।
আমি চমকে উঠলাম। এ শুভদিনে কী দুর্ঘটনা ঘটল? ছুটে যাব, এমন সময় কানের কাছে কে যেন উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, ‘পুরোনো যুগের বাংলা সিনেমার স্টাইলে ছবি তোলা হচ্ছে। নায়ক মারা যাচ্ছে, নায়িকা কোলে মাথা নিয়ে কাঁদছে। উত্তম-সুচিত্রার ভাইব আনা হচ্ছে। হেভি আর্টিস্টিক। শুধু এই সিনের জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ করে কোরিওগ্রাফার আনা হয়েছে।’
হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছি না।
৪) কয়েক দিন আগে আমার ভাগ্নিরা সব একজোট হয়ে কই যেন যাচ্ছে। সবাই সাদা জামা পরেছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কই যাস?’
একজন খুশিতে লাফাতে লাফাতে বলল, ‘আজ অমুকের বিয়ে উপলক্ষে রং খেলা হবে।’
‘রং খেলা!’ আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
‘হ্যাঁ, মামা। এটা পুরা আলাদা ইভেন্ট। বরপক্ষ আর কনেপক্ষ রং মারামারি করবে। এই প্রোগ্রামের জন্য আলাদাভাবে হল ভাড়া নেওয়া হয়েছে। দুই ড্রাম রং কেনা হয়েছে। তাই সবাই সাদা জামা পরেছি। সাদায় কালার ভালো ফুটে। দোয়া করো মামা, আমরা যেন জিততে পারি। নইলে বেইজ্জতির সীমা থাকবে না।’
আমার মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার অবস্থা!
৫) এতক্ষণ হেসেছেন? এবার ভাবুন।
এ ধরনের বিয়ে শুধু অপচয় নয়, সামাজিক অন্যায়।
এসব আয়োজনের উল্লাসের পেছনে কত বাবা ফকির হয়ে যাচ্ছেন, ভাবুন।
কত সদ্য চাকরিতে যোগ দেওয়া তরুণ এ ইঁদুরদৌড়ে সারাজীবনের জন্য ঋণের ফাঁদে পড়ছে, ভাবুন।
একটি বিয়ে উদাহরণ হয়ে অন্যদের ওপর কতটা চাপ তৈরি করছে, ভাবুন।
মধ্যবিত্ত বাবা এ ধরনের চাপে পড়বেন ভেবে কত মেয়ে তীব্র আতঙ্কে আছে, ভাবুন।
যাঁর আছে, তিনি করছেন। কিন্তু যাঁর নেই, তাঁকেও দেখাদেখির চাপে পড়ে এসব আয়োজন করতে হচ্ছে। তাঁর কষ্টের কথা ভাবুন।
এ ধরনের বিশাল আয়োজনের ব্যাপারটি হাসার নয়, কাঁদার। আজ না কাঁদলে কাল কাঁদতে হবে। কারণ তখন এ দায় নিজের উপর আসবে।
না কাঁদতে চাইলে এগুলো বন্ধ করুন।