দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা, তবু মিলল না কাঙ্ক্ষিত সমাধান। ১৯৭৯ সালের পর প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সর্বোচ্চ পর্যায়ের ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা কোনো চূড়ান্ত চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত এই ত্রিপক্ষীয় বৈঠক শেষে একে অপরকে দুষছে দুই দেশ। তবে এই ‘ব্যর্থ সংলাপের’ পরও পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, সেজন্য উভয় পক্ষকেই চলমান যুদ্ধবিরতি কঠোরভাবে মেনে চলার জোরালো আহ্বান জানিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উপস্থিতিতে এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পক্ষে ছিলেন পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। বৈঠক শেষে পাকিস্তান ছাড়ার আগে এক সংবাদ সম্মেলনে জেডি ভ্যান্স জানান, ২১ ঘণ্টার এই আলোচনা থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা হলেও কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তার দাবি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশনায় যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট নমনীয়তা ও সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে অংশ নিলেও ইরান তাদের শর্তগুলো মানেনি। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই ব্যর্থতার দায় চাপিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কাঁধেই। তিনি ওয়াশিংটনকে অতিরিক্ত ও অবৈধ দাবি পরিহার করে ইরানের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনার টেবিলে একটি চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেডি ভ্যান্স। তাদের মূল দাবি হলো, ইরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে বা সেই সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। ভ্যান্স জানান, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা হলেও দীর্ঘমেয়াদে পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর বিষয়ে তেহরানের কাছ থেকে মৌলিক প্রতিশ্রুতির অপেক্ষায় রয়েছে ওয়াশিংটন।
অন্যদিকে, ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার টেবিলে এমন কিছু দাবি করছে যা তারা যুদ্ধের ময়দানেও অর্জন করতে পারেনি। ইরানের সূত্র মতে, চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ইরানের কোনো তাড়াহুড়ো নেই এবং যৌক্তিক প্রস্তাব বিবেচনা করার দায়িত্ব এখন যুক্তরাষ্ট্রের। তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, একটি যুক্তিসঙ্গত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির কৌশলগত অবস্থানে কোনো পরিবর্তন তারা আনবে না। পাশাপাশি যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ আদায়, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং এই অঞ্চলে যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসানের মতো বিষয়গুলোতে জোর দিচ্ছে তারা।
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার খবরের পরপরই পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, টেকসই শান্তি ও সমৃদ্ধির স্বার্থে দুই পক্ষেরই যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দেন যে, দুই দেশের এই বৈরিতার অবসান ঘটাতে পাকিস্তান আগামী দিনগুলোতেও সংলাপ ও মধ্যস্থতার এই ধারা অব্যাহত রাখবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে ভয়াবহ হামলা চালায়। এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বহু শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা নিহত হন। জবাবে ইরানও ওই অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরায়েলি অবস্থানগুলোতে ব্যাপক পাল্টা হামলা চালায়। পরিস্থিতি শান্ত করতে পাকিস্তানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গত ৮ এপ্রিল থেকে দুই সপ্তাহের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যার ধারাবাহিকতাতেই এই ‘ইসলামাবাদ সংলাপ’-এর আয়োজন করা হয়েছিল। এখন দেখার বিষয়, কাঙ্ক্ষিত শান্তি চুক্তি ছাড়া এই যুদ্ধবিরতি শেষ পর্যন্ত কতদিন টেকে।