• রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ০৭:৩২ অপরাহ্ন

আমরা কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ঢাকা / ৬৯ Time View
Update : শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬

একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের মাঝামাঝি এসে বিশ্ব রাজনীতি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সবচেয়ে ভয়াবহ সময় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ক্ষত শুকানোর আগেই মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে জমতে শুরু করেছে ঘন কালো মেঘ। ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সরাসরি সংঘাত আজ এক মাস পেরিয়ে গেছে। এই যুদ্ধ শুধু তেহরান বা তেল আবিবে সীমাবদ্ধ নেই; বরং লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, কাতার এবং সৌদি আরবসহ অন্তত ১২টি দেশ এই আগুনের উত্তাপ অনুভব করছে। বিশ্বজুড়ে আজ একটিই আতঙ্কিত প্রশ্ন—আমরা কি অজান্তেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে পা বাড়াচ্ছি, নাকি এটি কেবলই এক অমূলক ভয়?

১. ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: দুর্ঘটনা না কি পরিকল্পনা?

ইতিহাসবিদদের মতে, বড় বড় বিশ্বযুদ্ধগুলো সব সময় সুপরিকল্পিতভাবে শুরু হয় না। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ইতিহাসের এমেরিটাস অধ্যাপক মার্গারেট ম্যাকমিলান বিষয়টিকে ‘স্কুলের মাঠের ঝগড়ার’ সাথে তুলনা করেছেন। ১৯১৪ সালে আর্চডিউক ফ্রানৎস ফার্দিনান্দকে হত্যার একটি ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনাই ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্ফুলিঙ্গ। জোটবদ্ধ দেশগুলো একে অপরের সমর্থনে যুদ্ধে নামতে নামতে সেটি একটি বৈশ্বিক বিপর্যয়ে রূপ নেয়।

বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিও ঠিক সেই পথেই হাঁটছে। ইরান যদি জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় বা মার্কিন কোনো বড় সামরিক ঘাঁটিতে সরাসরি আঘাত হানে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তার সর্বশক্তি নিয়ে যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য হবে। আর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে নামা মানেই ন্যাটোর মিত্রদের এবং অন্যদিকে রাশিয়ার মতো শক্তির পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়া। অধ্যাপক ম্যাকমিলানের মতে, যুদ্ধ অনেক সময় নেতাদের ‘অহংকার’ এবং ‘ভুল বোঝাবুঝি’র ফসল হিসেবে আবির্ভূত হয়।

২. আধুনিক বিশ্বযুদ্ধের সংজ্ঞা ও বর্তমান বাস্তবতা

লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক জো মাইওলোর মতে, বিশ্বযুদ্ধ হলো এমন একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ যেখানে পৃথিবীর সব বড় শক্তিগুলো সরাসরি লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি, জাপান ও ইতালির বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন লড়াই করেছিল।

বর্তমানে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেছেন যে, ভ্লাদিমির পুতিন ইতোমধ্যেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করে দিয়েছেন। তার মতে, পুতিন কেবল ইউক্রেন নয়, বরং পশ্চিমা জীবনধারাকে বদলে দিতে চান। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও তেল-গ্যাস ক্ষেত্রগুলোতে ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলার তীব্রতা প্রতিদিন বাড়ছে। যখন একটি আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং একাধিক মহাদেশের দেশগুলো অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন তাকে ‘আঞ্চলিক’ বলার সুযোগ কমে আসে।

৩. সংঘাতের বিস্তার: তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়া নিরাপত্তা

বর্তমান সংঘাতের একটি ভয়াবহ দিক হলো এর ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ বা শিকল বিক্রিয়া। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিতে পারে অন্যান্য বড় শক্তিগুলো।

  • চীনের কৌশল: পশ্চিমা বিশ্ব যখন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন নিয়ে ব্যস্ত, তখন চীন যদি তাইওয়ানে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ খোঁজে, তবে সেটি হবে এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট।

  • রাশিয়ার অবস্থান: মস্কো ইরানের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্বের কথা বললেও সরাসরি যুদ্ধে নামার সামর্থ্য বর্তমানে সীমিত। তবে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ বিভক্ত হওয়া রাশিয়ার জন্য ইউক্রেন ফ্রন্টে বড় জয়ের সুযোগ করে দেবে।

ম্যাকমিলান সতর্ক করেছেন যে, এক অঞ্চলের সংঘাত অন্য অঞ্চলে নতুন সংঘাতের পথ প্রশস্ত করে। যখন বিশ্বশক্তিগুলো একদিকে ব্যস্ত থাকে, তখন অন্য প্রান্তে থাকা বিরোধীরা সেই সুযোগ লুফে নিতে চায়।

৪. জ্বালানি ও অর্থনীতির মারণাস্ত্র

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কা কেবল কামানের গোলার শব্দে নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের রান্নাঘরেও পৌঁছে গেছে। ইরানের হাতে থাকা সবচাইতে বড় অস্ত্র হলো বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন—হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ২০-২২ শতাংশ এই রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো আমদানিকৃত তেলের বড় একটি অংশের জন্য এই রুটের ওপর নির্ভরশীল।

ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে তেলের তীব্র সংকট এবং দাম বৃদ্ধির গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রুটটি যদি একবার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে যা আধুনিক ইতিহাসের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। অর্থনৈতিক এই ধস অনেক দেশকে সামাজিক অস্থিরতা ও গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা বিশ্বযুদ্ধেরই একটি ভিন্ন রূপ।

৫. পারমাণবিক ছায়া ও নেতাদের ভূমিকা

অধ্যাপক মাইওলো মনে করেন, পারমাণবিক অস্ত্রের অস্তিত্বই হয়তো বড় শক্তিগুলোকে সরাসরি বড় যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত রাখছে। একে বলা হয় ‘Mutually Assured Destruction’ (MAD)—অর্থাৎ যুদ্ধ শুরু করলে কোনো পক্ষই রক্ষা পাবে না। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন ব্যক্তিগত অহংকার ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা সামনে চলে আসে।

ভ্লাদিমির পুতিন বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতারা অনেক সময় পরাজয় স্বীকার না করার জেদ থেকে যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে হিটলার যেমন পরাজয় নিশ্চিত জেনেও যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিলেন, বর্তমান নেতাদের মধ্যেও সেই ‘অহমিকা’ দেখা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

৬. কূটনীতি কি এখনো সম্ভব?

এত সব নেতিবাচক দিকের মাঝেও আশার আলো দেখছেন বিশ্লেষকরা। অধ্যাপক মাইওলোর মতে, তেহরান, ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব—তিন পক্ষই হয়তো বুঝতে পারছে যে যুদ্ধের মাধ্যমে তারা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে পারবে না।

  • সমঝোতার পথ: নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে ইরানের অবস্থান নিয়ে একটি বড় ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তিতে পৌঁছানোই হতে পারে শান্তির পথ।

  • মধ্যস্থতা: চীন ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো এই সংকটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করছে। কারণ একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বযুদ্ধ কারো জন্যই লাভজনক হবে না।

আমরা কি তবে নিরাপদ?

উপসংহারে বলা যায়, আমরা কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগোচ্ছি? এর সহজ কোনো উত্তর নেই। বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘অমূলক ভয়’ বলারও সুযোগ নেই। এটি একটি দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের মতো, যা যেকোনো মুহূর্তে বাতাসের গতি বদলে গিয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তবে ইতিহাস আমাদের যেমন যুদ্ধের কথা বলে, তেমনি শান্তির পথও দেখায়। স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনার সময়েও বিশ্বনেতারা নিজেদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেননি। বর্তমান সময়েও যদি বড় শক্তিগুলো নিজেদের অহংকার সরিয়ে রেখে আলোচনার টেবিলে বসে এবং ছোট ছোট ভুল বোঝাবুঝিগুলো দূর করতে সক্ষম হয়, তবেই মানবজাতি এই সম্ভাব্য ধ্বংসযজ্ঞ থেকে মুক্তি পেতে পারে। অন্যথায়, আমরা হয়তো ইতিহাসের সেই ট্র্যাজেডির দিকেই ধাবিত হচ্ছি, যেখানে কোনো বিজয়ী থাকবে না, থাকবে শুধু ধ্বংসস্তূপ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category