মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচাইতে ভয়াবহ ও বিধ্বংসী ২৪ ঘণ্টা পার করল মার্কিন সামরিক বাহিনী। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী সংঘাত শুক্রবার (৩ এপ্রিল) এক নতুন মোড় নিয়েছে। এদিন তেহরান মার্কিন বাহিনীকে যে ‘ডুমসডে’ বা কেয়ামতের নমুনা দেখিয়েছে, তাতে খোদ পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউস বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন ‘মিনিটম্যান-৩’ আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘ডুমসডে প্লেন’ (উড়ন্ত পেন্টাগন)-এর মহড়া দিয়ে ইরানকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের ৩৫তম দিনে এসে ইরান কার্যত সেই ‘ডুমসডে’ বা ধ্বংসের দিনের স্বাদ পাইয়ে দিল ওয়াশিংটনকে।
ইরানি বাহিনীর নজিরবিহীন হামলায় গত ২৪ ঘণ্টায় মার্কিন বিমান বাহিনীর দুই ডজন আকাশযান ভূপাতিত বা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচাইতে আলোচিত ঘটনা হলো মার্কিন পাইলটদের উদ্ধার অভিযানে যাওয়া হেলিকপ্টার ও অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ধ্বংস। ইরানের দাবি ও মার্কিন সামরিক সূত্রের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ক্ষয়ক্ষতির তালিকা নিম্নরূপ:
যুদ্ধবিমান: একটি এফ-১৫ই (F-15E) পুরোপুরি ধ্বংস এবং একটি এফ-১৬ (F-16) গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত। এছাড়া স্থল সেনাদের সহায়তাকারী একটি এ-১০ ওয়ার্টহগ ভূপাতিত হয়েছে।
হেলিকপ্টার: বিধ্বস্ত এফ-১৫ এর পাইলটদের খুঁজতে যাওয়া দুটি এইচএইচ-৬০ডব্লিউ জলি হেলিকপ্টার ইরানি গোলন্দাজ বাহিনীর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ড্রোন ও মিসাইল: তিনটি অত্যাধুনিক এমকিউ-৯ রিপার, একটি উইং লুং-২ এবং একটি হার্মিস ড্রোন ভূপাতিত হয়েছে। পাশাপাশি দুটি ক্রুজ মিসাইল ও বেশ কয়েকটি সুইসাইড ড্রোন ধ্বংস করেছে ইরান।
জরুরি সংকেত: ইরাকের আকাশে একটি এফ-১৬ এবং দুটি বোয়িং কেসি-১৩৫ স্ট্রাটোট্যাঙ্কার বিমান জরুরি ‘কোড ৭৭০০’ প্রেরণ করে কোনোমতে আত্মরক্ষা করেছে।
সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গত কয়েক দশকে এক দিনে এত বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ধ্বংসের নজির যুক্তরাষ্ট্রের নেই। এর আগে ২০১১ সালে আফগানিস্তানে চিনুক হেলিকপ্টার ভূপাতিত হয়ে ৩১ জন এবং ২০০৫ সালে ইরাকে একদিনে ৩৭ জন মার্কিন সৈন্য নিহত হওয়ার ঘটনাকে সবচাইতে বড় বিপর্যয় ধরা হতো। কিন্তু ২০২৬-এর ৩ এপ্রিলের এই আকাশপথের ধ্বংসযজ্ঞ প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত দিক থেকে মার্কিন বাহিনীর জন্য সবচাইতে বড় ‘পিছুটান’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতির খবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিশ্বমঞ্চে চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। বিশেষ করে অত্যাধুনিক এফ-১৫ এবং ড্রোনগুলোর পতন মার্কিন আকাশপথের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এর আগে গত ২ মার্চ কুয়েতের আকাশে তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটলেও শুক্রবারের আক্রমণ ছিল সরাসরি ইরানের মূল ভূখণ্ড ও তার মিত্রদের প্রতিরোধ যুদ্ধের ফসল।
সারসংক্ষেপ: ইরান আজ কেবল প্রতিরক্ষায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা মার্কিন শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীকগুলোতে আঘাত হেনে প্রমাণ করেছে যে, পারমাণবিক ‘ডুমসডে’ ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়েও মাঠ পর্যায়ের রণকৌশল অনেক সময় বেশি ভয়ংকর হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন ওয়াশিংটনের জন্য এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে।