যুদ্ধ সাধারণত ধ্বংস ডেকে আনে—দেশ ভাগে, মানুষ মরে, অর্থনীতি ভেঙে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ থমকে যায়। ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে দেখা যায়, যুদ্ধের কেন্দ্রে থাকা দেশগুলোর ক্ষতিই সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বৈশ্বিক রাজনীতির দাবা খেলায় এমন কিছু খেলোয়াড় থাকে, যারা যুদ্ধে সরাসরি অংশ না নিয়েও সংকটের ভেতর থেকে নিজেদের স্বার্থ ঠিকই বের করে আনে। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ঠিক এমনই এক ‘মাস্টারস্ট্রোক’ খেলছে ভারত।
ঘটনার শুরু ৮ মার্চ। বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ও সামরিক নিয়ন্ত্রিত জলপথ হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশ করে একটি তেলের জাহাজ। চারদিকে যুদ্ধের চরম উত্তেজনা, মিসাইল হামলা চলছে। ঠিক সেই মুহূর্তে জাহাজটি পৃথিবীর সব রাডার থেকে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়!
এটি কোনো দুর্ঘটনা বা জাদুর কারিশমা ছিল না, ছিল নিখুঁত পরিকল্পনা। ‘সেনলং’ নামের ওই জাহাজে বোঝাই ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন সৌদি ক্রুড অয়েল (অশোধিত তেল), যার গন্তব্য ছিল ভারত। কয়েক ঘণ্টার জন্য জাহাজটি তার এআইএস (AIS) ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে সম্পূর্ণ ‘ডার্ক মোডে’ চলে যায়।
যেখানে হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন ও ইউরোপীয় জাহাজ আটকে দেওয়া হচ্ছে, ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট জাহাজ হামলার শিকার হচ্ছে (যেমন: এক্সপ্রেস রোম ও ময়ূরী নারী), সেখানে এই বিশাল তেলের জাহাজটি নিরাপদে পার হলো কীভাবে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে মাত্র তিনটি ফোন কলে!
হরমুজ প্রণালী শুধু একটি সমুদ্রপথ নয়, এটি বিশ্বের তেলের শ্বাসনালি। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এই রুট অবরুদ্ধ করে ইরান কার্যত এর ‘গেটকিপার’-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ইরানের বিপ্লবী গার্ড ঘোষণা দেয়, অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই পথ পার হতে পারবে না।
বিশ্বশক্তি যখন এই ঘোষণায় প্রমাদ গুনছে, ভারত তখন শুরু করে এক নীরব অপারেশন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর সরাসরি কথা বলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে।
২৮ ফেব্রুয়ারি
৫ মার্চ
১০ মার্চ
এই তিনটি ফোনালাপে কোনো হুমকি বা চাপ ছিল না, ছিল কেবল ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার কথা। ফলস্বরূপ, ইরান ভারতীয় জাহাজের জন্য একটি অদৃশ্য নিরাপদ করিডোর তৈরি করে দেয়। ৯ মার্চ ট্র্যাকিং সিস্টেমে আবার ভেসে ওঠে জাহাজটি এবং ১১ মার্চ সেটি নিরাপদে মুম্বাই বন্দরে নোঙর করে। যুদ্ধ শুরুর পর এটিই ছিল ভারতের উদ্দেশে আসা প্রথম নিরাপদ তেলের চালান।
ভারতের এই সাফল্যের আসল রহস্য হলো তাদের ‘কৌশলগত ভারসাম্য’। দিল্লি এমন এক অবস্থান তৈরি করেছে যেখানে:
ইরান ভাবে ভারত তাদের বন্ধু (চাবাহার বন্দর প্রকল্প এবং দীর্ঘ জ্বালানি সম্পর্ক)।
ইসরায়েল ভাবে ভারত তাদের অন্যতম বড় প্রতিরক্ষা সহযোগী (ড্রোন, মিসাইল ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়)।
যুক্তরাষ্ট্র ভাবে ভারত তাদের অপরিহার্য এশীয় অংশীদার।
“প্রকাশ্যে নিরপেক্ষ থাকলেও ভেতরে ভারতের হিসাব একেবারে ভিন্ন। একে অনেকেই দ্বিমুখী নীতি বললেও, কূটনীতির ভাষায় এটি হলো ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন।”
একটি ভুল বিবৃতি দিলেই হরমুজ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, আর তার প্রভাব পড়বে ভারতের অর্থনীতিতে। বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮৭ ডলার ছাড়িয়েছে। এটি ১০০ ডলার ছুঁলে ভারতের মূল্যস্ফীতি বিস্ফোরিত হতে পারে। তাই ভারত কোনো পক্ষ না নিয়ে নিজের অর্থনীতি বাঁচানোর রাস্তা তৈরি করেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকেই পারস্য উপসাগরে থাকা ভারতীয় নাবিক ও জাহাজ পর্যবেক্ষণের জন্য ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম চালু করে দিল্লি। এটি ছিল অস্ত্র ছাড়া এক সামরিক স্তরের প্রস্তুতি। আধুনিক বিশ্বে শক্তি শুধু সেনাবাহিনী বা অস্ত্র দিয়ে মাপা যায় না। সঠিক সময়ে কার সাথে যোগাযোগ করতে হবে, কাকে রাগানো যাবে না এবং কাকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়া যাবে না—এই সিদ্ধান্তগুলোই হলো নতুন যুগের ক্ষমতা।
পুরো বিশ্ব যখন আতঙ্কে, বাজার যখন টালমাটাল, তখন বিনা ঘোষণায় একটি তেলের ট্যাংকার নিরাপদে মুম্বাই বন্দরে ঢুকে পড়া প্রমাণ করে—যুদ্ধের যুগেও সঠিক কূটনীতি দিয়ে দাবার গুটি নিজের পক্ষে আনা সম্ভব।