সংযুক্ত আরব আমিরাতের হয়ে ইয়েমেনে ‘টার্গেটেড কিলিং’ বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যার মিশনে অংশ নিয়ে বিপুল অর্থ আয়ের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এবং এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর সাবেক সদস্যরা একটি বেসরকারি সামরিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই দুর্ধর্ষ অভিযানে লিপ্ত ছিলেন।
আদালতের নথি ও তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আব্রাহাম গোলান নামের এক সাবেক মার্কিন সেনা ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোতে ‘স্পিয়ার অপারেশনস গ্রুপ’ নামে একটি প্রাইভেট মিলিটারি কন্ট্রাক্টিং ফার্ম গড়ে তোলেন। তার সঙ্গে যোগ দেন সাবেক নেভি সিল (Navy SEAL) আইজ্যাক গিলমোর।
বিপুল পারিশ্রমিক: অভিযোগ রয়েছে, আরব আমিরাতের সাথে চুক্তির ভিত্তিতে এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে ১৫ লাখ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা) পারিশ্রমিক পেত।
বোনাস সিস্টেম: প্রতিটি সফল হত্যাকাণ্ডের জন্য আলাদাভাবে মোটা অঙ্কের বোনাস দেওয়া হতো বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইয়েমেনের একজন প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা আনসাফ আলি মায়ো দাবি করেছেন, ২০১৫ সালে তাকে হত্যার জন্য এই ভাড়াটে খুনিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। মায়োর মতে, এটি ছিল ইয়েমেনের রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্মূল করার জন্য আরব আমিরাতের একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
২০১৮ সালে এক সাক্ষাৎকারে গোলান নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, তারা ইয়েমেনে একটি টার্গেটেড কিলিং প্রোগ্রাম পরিচালনা করতেন, যা আমিরাত সরকার অনুমোদিত ছিল। গোলান ছাড়াও সাবেক মার্কিন কমান্ডো ডেল কমস্টকও এই অভিযানে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন।
আনসাফ আলি মায়ো বর্তমানে মার্কিন আদালতে এই সাবেক সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেছেন।
এলিয়েন টর্ট স্ট্যাটিউট (Alien Tort Statute): সাধারণত মার্কিন নাগরিক না হলে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা করা কঠিন। কিন্তু এই বিশেষ আইনের অধীনে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকরাও মার্কিন আদালতে বিচার চাওয়ার সুযোগ পান।
আমিরাতের অবস্থান: সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেনে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে নিজেদের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করলেও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের টার্গেট করার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে।
২০১৫ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও উত্তরাঞ্চল ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা দখল করে নিলে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। হুতিদের দমনে সৌদি আরবের নেতৃত্বে যে আঞ্চলিক জোট গঠিত হয়েছিল, আরব আমিরাত ছিল তার অন্যতম প্রধান সদস্য। সেই যুদ্ধের আড়ালেই এই ধরনের ভাড়াটে সেনা নিয়োগ করে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে বেসরকারি সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো (Private Military Companies) অনেক সময় আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করে বিপজ্জনক ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত হয়।