• শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৩ অপরাহ্ন

গোপনে আবারও ড্যাপ সংশোধন:  বুড়িগঙ্গার বুকে শেষ পেরেক

Reporter Name / ২ Time View
Update : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

মেগাসিটি ঢাকার পরিবেশ ও জনজীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপ গ্রহণ করা হয়েছিল, একের পর এক গোপন ও বিতর্কিত সংশোধনে তা এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে। অংশীজনদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে এবং কোনো ধরনের উন্মুক্ত গণশুনানি বা কারিগরি যাচাই-বাছাই ছাড়াই ড্যাপের গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালায় বড় ধরনের তিনটি পরিবর্তন এনেছে সরকার। বিশেষ করে বুড়িগঙ্গার অত্যন্ত সংবেদনশীল তীরবর্তী উন্মুক্ত স্থানকে ভারী শিল্পের উপযোগী হিসেবে ঘোষণা এবং বিরোধপূর্ণ বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্পের আইনি বাধা প্রত্যাহার করার মধ্য দিয়ে পুরো নগরীর বাসযোগ্যতাকে এক নতুন ও গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এমন আত্মঘাতী পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন দেশের শীর্ষ নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশ গবেষক ও সাধারণ নাগরিকরা। তাদের স্পষ্ট অভিমত, মুনাফালোভী আবাসন ও শিল্পগোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে গোটা ঢাকাবাসীকে স্থায়ী জলাবদ্ধতা, দুঃসহ পরিবেশদূষণ এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

ঢাকার নগর উন্নয়নকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে আনতে ২০২২-২৩ সালে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছিল। সেই মহাপরিকল্পনায় অতিরিক্ত জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ, পার্ক ও খেলার মাঠসহ উন্মুক্ত স্থান বাড়ানো, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা এবং বন্যার স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনের পথ কোনোভাবেই যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা ছিল। কিন্তু পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই একের পর এক আপত্তির অজুহাতে প্রভাবশালী মহল এটিকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত বিগত সরকারের আমলে আবাসন ব্যবসায়ীদের চাপে ভবনের উচ্চতা ও ফ্লোর এরিয়া রেশিও বা এফএআরের মতো গুরুত্বপূর্ণ নিয়মে ছাড় দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালেও ড্যাপের বেশকিছু সংজ্ঞাসহ প্লাবনভূমির নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের অধীনে গত ১৪ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা পূর্ববর্তী সব বিকৃতি ও আপসকামিতাকে ছাড়িয়ে গেছে। এবার কার্যত ঢাকার শেষ প্রাকৃতিক সুরক্ষা কবচ বুড়িগঙ্গার পাড় এবং প্রাকৃতিক জলাভূমিকে আগ্রাসনের মুখে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-২ থেকে জারি করা ওই প্রজ্ঞাপনে দেখা যায়, রাজধানীর কেরানীগঞ্জ সংলগ্ন আইলবহর মৌজার মহানগর জরিপের ১০৪৭, ১০৪৮ এবং ১০৫০ নম্বর দাগের বিশাল এলাকাকে ড্যাপের মূল নকশায় উন্মুক্ত স্থান হিসেবে চিহ্নিত রাখা হয়েছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের জারি করা নতুন আদেশে এই উন্মুক্ত স্থান বা ওপেন স্পেসের মর্যাদা সম্পূর্ণ বাতিল করে সেখানে সরাসরি ভারী শিল্প এলাকা গড়ে তোলার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। লোকদেখানো শর্ত হিসেবে কেবল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআইডব্লিউটিএর অনুমোদন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অনাপত্তির কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় হালট সংরক্ষণ এবং ভবন তৈরির ক্ষেত্রে রাজউকের ছাড়পত্র নেওয়ার দায়সারা শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ এই পুরো এলাকাটি সরাসরি বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত, যা এমনিতেই বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য ও অপরিশোধিত তরল বর্জ্যের কারণে বহু আগেই তার স্বাভাবিক প্রতিবেশগত ভারসাম্য হারিয়েছে।

পরিবেশ আইন অনুযায়ী, ২০০৯ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের আওতায় বুড়িগঙ্গা নদী ও এর চারপাশের চার কিলোমিটার এলাকাকে পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা বা ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এই আইনের সুস্পষ্ট বিধান অনুযায়ী, সংকটাপন্ন ঘোষিত এলাকায় নদীদূষণকারী কোনো কারখানা স্থাপন, বিষাক্ত তরল বা রাসায়নিক বর্জ্য নিষ্কাশন, জলজ প্রাণীর ক্ষতিসাধন এবং যেকোনো ধরনের ক্ষতিকর অবকাঠামো নির্মাণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু ড্যাপের এই সংশোধনের মাধ্যমে খোদ সরকারের পক্ষ থেকেই সেই কঠোর পরিবেশ আইনকে পুরোপুরি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে। কারণ ড্যাপের নিজস্ব সংজ্ঞাতেই উল্লেখ রয়েছে যে, ভারী শিল্প থেকে উচ্চমাত্রার শব্দদূষণ, মারাত্মক ভূকম্পন, বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ও বিপজ্জনক রাসায়নিক বর্জ্য নির্গত হয়, যা মানববসতি ও প্রতিবেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনে। এমন এক শিল্পকে বুড়িগঙ্গার তীরে উন্মুক্ত স্থানে বসানোর সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনার অংশ হতে পারে না।

এই প্রজ্ঞাপনে যুক্ত হওয়া দ্বিতীয় এবং তৃতীয় সংশোধনীগুলোও রাজধানীর সার্বিক পানি নিষ্কাশন ও নগর ব্যবস্থাপনার জন্য সমান ধ্বংসাত্মক। দ্বিতীয় সংশোধনীতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিজস্ব আবাসিক প্রকল্প পূর্বাচল ও ঝিলমিলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ কাঠা বা তার চেয়ে বড় আয়তনের প্লটের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক পাঁচ হারে বাড়তি এফএআর প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা নির্দিষ্ট কিছু প্লট মালিক ও আবাসন নির্মাতাকে বিশেষ সুবিধা দেবে। আর তৃতীয় সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ড্যাপে যে সমস্ত এলাকাকে বিরোধপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, অর্থাৎ যেগুলো একই সঙ্গে আবাসিক এবং বন্যাপ্রবাহ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত, সেখানে এখন থেকে যেকোনো বেসরকারি আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আর কোনো আইনি বাধা থাকবে না। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে কার্যত রাজধানীর চারপাশের প্রাকৃতিক প্লাবনভূমি ও জলাধারগুলো স্থায়ীভাবে ভরাট করে ফেলার সবুজ সংকেত দেওয়া হলো।

পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি প্রাণবন্ত নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে সবসময় উন্মুক্ত স্থান বা সবুজ বলয় থাকা উচিত, যাতে নগরবাসী মুক্ত বাতাসের স্পর্শ পায় এবং নদী ও মানুষের মধ্যে একটি স্বাভাবিক সংযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে ঢাকার জুরাইন ও শ্যামপুরের মতো চরম নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই সিদ্ধান্তকে চরম বৈষম্যমূলক বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এই অঞ্চলে এমনিতেই কোনো খেলার মাঠ নেই, হাঁটার জন্য ফুটপাত নেই, এমনকি পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর মতো একটি ছোট পার্কও অবশিষ্ট নেই। সারা বছর জলাবদ্ধতা, কলকারখানার উৎকট কালো ধোঁয়া এবং বায়ুদূষণের মধ্যে বসবাস করা লাখ লাখ মানুষকে এবার তাদের ঘরের কাছে নতুন ভারী শিল্পের বিষবাষ্প গিলতে বাধ্য করা হচ্ছে। স্থানীয় অধিবাসীদের তীব্র ক্ষোভ, যেখানে তাদের মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি ছিল, সেখানে সুস্থভাবে বাঁচার অধিকারটুকুও ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

ড্যাপ প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞ নগর পরিকল্পনাবিদরা এই পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ড্যাপের মূল পরিকল্পনায় বিরোধপূর্ণ এলাকায় জলাভূমির স্বাভাবিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ রেখে কেবল শর্তসাপেক্ষে ভূমি ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয় সেই সুপারিশের সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হেঁটে সরাসরি প্লাবনভূমিতে কংক্রিটের আবাসন গড়ে তোলার অনুমতি দিয়েছে। এর ফলে বর্ষা মৌসুমে ঢাকার পানি নামার যে স্বাভাবিক করিডোর ছিল, তা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। এর সরাসরি পরিণতি হিসেবে সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো ঢাকা শহর পানির নিচে তলিয়ে যাবে এবং ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দেবে। পাশাপাশি জলাভূমি ভরাটের কারণে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আরও নিচে নেমে যাবে এবং গ্রীষ্মকালে নগরজুড়ে ‘হিট আইল্যান্ড’ বা অসহনীয় তাপমাত্রার প্রভাব তৈরি হবে। এ ধরনের মৌলিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কোনো ধরনের জলতাত্ত্বিক সমীক্ষা বা হাইড্রোলজিক্যাল সার্ভে না চালানোকে অপরাধতুল্য অবহেলা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রক্রিয়াগত দিক থেকেও এই সিদ্ধান্তটি চরম অস্বচ্ছ এবং অগণতান্ত্রিক। নগর পরিকল্পনার বিশ্বজনীন নিয়ম অনুযায়ী, ড্যাপের মতো একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত নথিতে যেকোনো ধরনের সংযোজন বা বিয়োজন করতে হলে রাজউকের নিজস্ব কারিগরি কমিটির পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন ও সুপারিশ প্রয়োজন হয়। এরপর সেই খসড়া জনসম্মুখে প্রকাশ করে অংশীজন ও নগরবাসীর আনুষ্ঠানিক মতামত নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, খোদ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বর্তমান চেয়ারম্যান পর্যন্ত স্বীকার করেছেন যে মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে রাজউক সম্পূর্ণ অজ্ঞ। কোনো কারিগরি কমিটির সুপারিশ কিংবা বোর্ডসভার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই মন্ত্রণালয় কীভাবে একক ক্ষমতাবলে এমন যুগান্তকারী ও ক্ষতিকর পরিবর্তন চাপিয়ে দিল, তা নিয়ে গভীর রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) এই স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে একটি সুপরিকল্পিত প্রহসন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ক্ষমতার পালাবদলে সরকার পরিবর্তন হলেও রাজউকের পরিকল্পনা নিয়ে অশুভ খেলা কখনোই বন্ধ হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বারবার ড্যাপ কেটেছেঁটে ব্যবসায়ীবান্ধব করা হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারও সেই পথেই হেঁটেছিল এবং বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এসেই বছর না ঘুরতেই সেই একই ধ্বংসাত্মক পথে পা বাড়িয়েছে। পরিবেশ রক্ষা ও বাসযোগ্য নগর গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে এভাবে জনস্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে সংকীর্ণ গোষ্ঠীস্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া কোনো দায়িত্বশীল সরকারের কাজ হতে পারে না।

নগর উন্নয়ন ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, অবিলম্বে ড্যাপের এই সর্বশেষ সংশোধনী বাতিল করা না হলে ঢাকার পরিবেশগত বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে। নদীমাতৃক এই দেশের রাজধানী ঢাকাকে বাঁচাতে হলে বুড়িগঙ্গাকে তার স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে এবং বন্যাপ্রবাহের পথগুলোকে যেকোনো মূল্যে উন্মুক্ত রাখতে হবে। কোনো বিশেষ ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে অবৈধ সুবিধা দিতে গিয়ে দুই কোটি মানুষের আবাসস্থল ঢাকাকে একটি বসবাসের অযোগ্য মরুভূমিতে পরিণত করার এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সরকারের অনতিবিলম্বে সরে আসা উচিত।

তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category