মধ্যপ্রাচ্যের দুই পরাশক্তি—ইরান এবং সৌদি আরব। এদের মধ্যকার বৈরিতা শুধু এই দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও দশকের পর দশক ধরে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে যে ‘ছায়া যুদ্ধ’ বা প্রক্সি ওয়ার চালিয়ে যাচ্ছে, তাকে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম প্রধান “স্নায়ুযুদ্ধ” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
ইরান ও সৌদি আরবের এই বৈরিতার পেছনে মূলত ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক কারণ জড়িত।
ধর্মীয় ও আদর্শগত নেতৃত্ব: সৌদি আরব সুন্নি মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দেওয়ার দাবি করে এবং দেশটিতে কট্টর ওহাবি মতবাদের প্রভাব রয়েছে। অন্যদিকে, ইরান নিজেকে শিয়া মুসলিম বিশ্বের রক্ষাকর্তা ও প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই শিয়া-সুন্নি বিভাজনই তাদের দ্বন্দ্বের সবচেয়ে পুরোনো ভিত্তি।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব: আধুনিক এই দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত সূত্রপাত হয় ১৯৭৯ সালে। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর ধর্মীয় নেতারা ক্ষমতায় আসেন এবং রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। ইরান তখন প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয় যে তারা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও এই বিপ্লব ছড়িয়ে দেবে। সৌদি আরবের রাজপরিবার এটিকে তাদের অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে গ্রহণ করে।
আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই (প্রক্সি যুদ্ধ): মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রক কে হবে, তা নিয়ে এই দুই দেশের মধ্যে নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। তারা সরাসরি একে অপরের ভূখণ্ডে হামলা না করলেও বিভিন্ন দেশে সশস্ত্র গোষ্ঠী বা সরকারকে সমর্থন দিয়ে ছায়া যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত শিয়া হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান চালিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। একইভাবে সিরিয়া, ইরাক এবং লেবাননেও দেশ দুটির বিপরীতমুখী অবস্থান রয়েছে।
ইরান এবং সৌদি আরব—উভয় দেশই বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী এবং ওপেক (OPEC)-এর অত্যন্ত প্রভাবশালী সদস্য। তাদের মধ্যকার এই ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বৈশ্বিক তেলের বাজারে সরাসরি যে প্রভাবগুলো ফেলে তা হলো:
সরবরাহ পথে চরম হুমকি: বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের প্রায় ২০-৩০ শতাংশ পরিবাহিত হয় পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগরের সংযোগস্থল ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে। এছাড়া লোহিত সাগরের ‘বাব এল-মান্দেব’ প্রণালীও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট। ইরান বা তাদের সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা প্রায়ই এই রুটগুলোতে তেলবাহী জাহাজে হামলা বা বাধা দেওয়ার হুমকি দেয়। এতে তেলের বৈশ্বিক সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়।
তেল স্থাপনায় সরাসরি হামলা: প্রক্সি যুদ্ধের কারণে সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলো বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ২০১৯ সালে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘আরামকো’-এর বড় দুটি স্থাপনায় (আবকাইক ও খুরাইস) ভয়াবহ ড্রোন ও মিসাইল হামলা হয়, যার দায় স্বীকার করে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা (যদিও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানকে দায়ী করেছিল)। এই এক হামলার কারণে সাময়িকভাবে বৈশ্বিক তেল উৎপাদন প্রায় ৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল।
তেলের দামের অস্থিতিশীলতা (Price Volatility): যখনই ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে বা প্রক্সি যুদ্ধের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, তখনই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দাম হু হু করে বেড়ে যায়। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ‘সাপ্লাই শক’ বা সরবরাহ ঘাটতির আতঙ্ক তৈরি হয়। তেলের দাম বাড়লে বিশ্বজুড়ে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়ে, যার ফলে বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়।
ওপেকের (OPEC) ভেতরে রাজনীতি: তেলের উৎপাদন কমানো বা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে ওপেকের বৈঠকে প্রায়ই এই দুই দেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রতিফলন দেখা যায়। সৌদি আরব চায় তেলের বাজার তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকুক, অন্যদিকে ইরান সবসময় পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের কোটা নিয়ে দরকষাকষি করে। তাদের মতবিরোধের কারণে অনেক সময় তেলের বাজারে সঠিক ভারসাম্য আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরব তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক আবার স্থাপন করলেও, তাদের মধ্যকার গভীর অবিশ্বাস ও আদর্শগত দ্বন্দ্ব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। বরং পর্দার আড়ালে কে কার চেয়ে বেশি শক্তিশালী হবে, সেই লড়াই আজও চলমান। এই দুই দেশের প্রক্সি যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিই বিনষ্ট করছে না, বরং বিশ্বের প্রতিটি দেশের মানুষের পকেটে থাকা অর্থের (তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে) ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।