ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানিকে হত্যার কড়া প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েলের জনবহুল শহর তেল আবিবে প্রাণঘাতী ‘ক্লাস্টার ওয়ারহেড’ বা গুচ্ছ বোমা সমৃদ্ধ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে তেহরান। গত মঙ্গলবার রাতে চালানো এই হামলায় অন্তত দুজনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক প্রতিবেদনে এই ক্লাস্টার বোমা হামলার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। এই হামলার মধ্য দিয়ে চলমান যুদ্ধে ইসরায়েলে নিহতের মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ১৪ জনে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, চলমান এই বহুমুখী সংঘাতে ইরান বারবার ক্লাস্টার বা গুচ্ছ বোমা ব্যবহার করছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই ধরনের অস্ত্র নিক্ষেপের পর তা মাঝআকাশে অসংখ্য ছোট ছোট বিস্ফোরকে বিভক্ত হয়ে বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেও এগুলোকে প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ইসরায়েলের দিকে ধেয়ে আসা এসব ক্ষেপণাস্ত্র বুধবার পশ্চিম তীরের হেবরনের আকাশেও দৃশ্যমান হয়েছে। অন্যদিকে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিকটবর্তী একটি এলাকায় একটি প্রজেক্টাইল বা অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) অবহিত করা হয়েছে। তবে এতে কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। পারমাণবিক দুর্ঘটনার ভয়াবহ ঝুঁকি এড়াতে আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রসি চলমান এই সংঘাতের সময়ে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
এর আগে, মঙ্গলবার ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে যে, সোমবার রাতে ইসরায়েলি হামলায় তাদের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান ও শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি নিহত হয়েছেন। একই হামলায় তাঁর ছেলে এবং ডেপুটি আলিরেজা বায়াতও প্রাণ হারিয়েছেন। যুদ্ধের প্রথম দিনে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর, এখন পর্যন্ত নিহত হওয়া সবচেয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হলেন লারিজানি। ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে যেকোনো মূল্যে বিরত রাখাই তাদের এই যৌথ সামরিক অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই লক্ষ্য ঘিরেই মূলত সংঘাত দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
পাল্টাপাল্টি এই রক্তক্ষয়ী হামলার মধ্যেই ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া মোজতবা খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে উত্তেজনা কমানো বা যেকোনো ধরনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তার বরাতে জানা যায়, দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের প্রথম পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত বৈঠকে মোজতবা খামেনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এটি শান্তির জন্য কোনো উপযুক্ত সময় নয়। ওই কর্মকর্তার মতে, মোজতবা খামেনি ঘোষণা করেছেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল নতি স্বীকার করছে, পরাজয় মেনে নিচ্ছে এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তির বিন্দুমাত্র কোনো সুযোগ নেই। তবে গত সপ্তাহে বাবার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনিকে এখনও জনসমক্ষে, কোনো ছবিতে বা টেলিভিশনের পর্দায় দেখা যায়নি। তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন, নাকি দূর থেকে ভার্চুয়ালি অংশ নিয়েছেন, সেটিও ওই কর্মকর্তা পরিষ্কার করেননি।