খুব ছোটোবেলায় বড় আপার সাথে ঘুমাতাম। মেজ আপা খাইয়ে দিতেন। সেজ আপা বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে যাওয়ার সময় আমাকে সাজিয়ে-গুছিয়ে সঙ্গে নিতেন। ক্লাস থ্রি-ফোর পর্যন্ত ছোট আপা স্কুলে নিয়ে যেতেন। তারপর দুজন ছোটো ভাই হলো। তাদের পড়াতাম, শাসন করতাম, আবার প্রচণ্ড আদরও করতাম।
এখন সবার বয়স হয়েছে। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু এখনো আমরা ভাইবোনরা একত্রিত হলে যে স্বর্গীয় আনন্দ পাই, তার তুলনা নেই।
ব্যাপারটি খুব সৌভাগ্যের। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, সব পরিবারে এমন হয় না। ছোটোবেলার প্রাণের সঙ্গী ভাইবোনদের মধ্যে বড় হলে কেমন যেন দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়।
সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। অথচ এটা হওয়ার কথা না। ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় আইন এ ব্যাপারে পরিষ্কার সমাধান দিয়েছে। সেটি মেনে চললে সমস্যা কী? লোভ ছাড় দিয়ে বন্ধনকে গুরুত্ব দিলে দুনিয়া ও আখেরাত-দুটোতেই লাভ।
সব ভাইবোন সমান হয় না। যিনি বা যারা বেশি প্রতিষ্ঠিত হন, তাঁরা যদি অহংকারী হন, তবে অন্য ভাইবোনরা দূরে সরে যান। আমার মাথায় ঢোকে না, ভাইবোনের সাথে ডাঁট দেখানোর কী আছে?
৩) আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার পার্থক্য:
এটি ভাইবোনদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। এ ক্ষেত্রে সামর্থ্যবান ভাই কিংবা বোনের দায়িত্ব হচ্ছে, অন্যরা যাতে হীনম্মন্যতায় না ভোগেন, সেদিকে খেয়াল রাখা। তিনি অন্যদের বিপদে-আপদে ঢাল হিসেবে দাঁড়ালে দূরত্ব বাড়ে না, কমে।
অনেক সময় জীবনসঙ্গীর কারণেও দূরত্ব তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে বিয়ের প্রথম দিকেই স্বামী-স্ত্রী দুজনের বোঝাপড়া হওয়া উচিত যে, রক্তের বন্ধনকে অস্বীকার করা কখনো সম্ভব নয়।
অনেক সময় ভাইবোনেরা নিজেদের মধ্যে তুলনা শুরু করেন। এ ধরনের তুলনা হিংসার ফ্যাক্টরি, যা একে অপরকে দূরে ঠেলে দেয়।
সবার ছেলেমেয়েও এক রকম হয় না। যার সন্তান ভালো করছে, তিনি যদি নিজের সন্তানের সঙ্গে অন্যের সন্তানদের তুলনা করে খোঁটা দেন, তবে দূরত্ব তৈরি হতে বাধ্য। আবার অন্যরা নিজের সন্তান সেরকম ভালো না করলে হীনম্মন্যতায় ভুগলেও সমস্যা। ভাইবোনের বাচ্চা তো নিজের বাচ্চাই। তাদের তুলনায় টেনে আনা কখনোই উচিত নয়।
বড় হওয়ার পর যার যার পরিবার হয়। নিজস্ব জীবন গড়ে ওঠে। প্রাইভেট লাইফ তৈরি হয়। সেখানে অযথা নাক গলালে বিরক্তি সৃষ্টি হয়। একটা বয়সের পর সবার নিজের মতো চলার অধিকার আছে। সেটাকে সম্মান করা উচিত। তবে কোনো গুরুতর ভুল করলে সুন্দর করে বোঝানো উচিত।
যেসব ব্যাপার ভাইবোনদের জানানো উচিত, তা না জানালে তাঁরা মন খারাপ করেন। অভিমান করে দূরে সরে যান।
৯) সোশ্যাল মিডিয়া চ্যাট গ্রুপ:
অনেক পরিবারের সদস্যরা যোগাযোগের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় চ্যাট গ্রুপ খোলেন। এতে শুধু পারিবারিক বিষয়, সুখস্মৃতি, বিভিন্ন পরিকল্পনা —এগুলো নিয়ে আলোচনা করাই ভালো। কোনো বিতর্কিত বিষয় এখানে তোলা উচিত নয়। যার যার বিশ্বাস নিয়ে সে থাকুক। এখন আর কেউ ছোটো নেই যে আমার মতামত মেনে নেবে বরং তা অযথা তিক্ততা সৃষ্টি করবে।
জীবনযুদ্ধের ব্যস্ততাও ভাইবোনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে। তাই যত ব্যস্ততাই থাকুক, ভাইবোনদের নিয়মিত যোগাযোগ রাখা উচিত। সরাসরি সবসময় দেখা না হলেও ভিডিও কলে নিয়মিত সবাই একত্রিত হয়ে কথা বলতে পারেন।
আমরা যখন জন্ম নিই, তখন আশপাশেই ভাইবোন থাকে। যখন বড় হই, তখনও তারা থাকে। আমরা একটি ডিম ভাজি ভাগাভাগি করে খাই। বড় ভাই বা বোনের জামা ছোট হয়ে গেলে অন্যরা তা পরি।
এভাবেই আমরা একসাথে বড় হই। তারপর ভাগ ভাগ হয়ে যাই!
আবার যখন মারা যাই, তখনও স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যার সাথে ভাইবোনরাও পাশে থাকে। ভাই খাটিয়া বহন করে শেষ শয্যায় শুইয়ে দিয়ে আসে।
মাঝখানে খালি খালি দূরত্ব!
ব্যাপারটা একদম ঠিক না। একদম না।
অনেক আগের একটি ঘটনা বলি। আম্মার মুখে শোনা। সম্ভবত ১৯৪৯ সালের ঘটনা। তাঁর এক কাজিন সিএসপি পাস করেছিলেন। তখন তাঁর বড় ভাই নাকি ‘আঁর ভাই সিএসপি অঁইয়ি’ (আমার ভাই সিএসপি হয়েছে) বলে দৌড়াতে দৌড়াতে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে খবর দিতে গিয়ে তীব্র গরমে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন।
ভদ্রলোক সিএসপি হয়ে গ্রামে বেড়াতে এলে খালি পায়ে হাঁটতেন। কারণ তাঁর বড় ভাই স্যান্ডেল পরায় অভ্যস্ত ছিলেন না। তিনি তাঁর সম্মানে পা খালি রাখতেন।
‘আঁর ভাই সিএসপি অঁইয়ি’—এটা বলে রোদের মধ্যে দৌড়াতে দৌড়াতে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কিংবা বড় ভাইয়ের সম্মানে খালি পায়ে হাঁটা — এগুলোই ভাইবোনদের বড় হতে দেয় না। সারাজীবন ছোটোবেলার মমতায় ঘিরে রাখে।