• রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪৭ অপরাহ্ন
Headline
পাম্পে হাহাকার, অথচ উপচে পড়ছে ডিপো: দেশীয় প্রতিষ্ঠানের অকটেন নিচ্ছে না সরকার নথিতে ‘রেকর্ড মজুত’, বাস্তবে হাহাকার বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্বিগুণ, দেশে বাড়ানো হয়েছে ‘সামান্য’: জ্বালানিমন্ত্রী ওসমান হাদি হত্যা: আদালতে দায় স্বীকার করলেন অস্ত্র সরবরাহকারী হেলাল হামের প্রাদুর্ভাব ও টিকাবঞ্চিত শিশুর ভবিষ্যৎ: দায় কার? বোরো ধান ঘরে তোলা নিয়ে চরম শঙ্কা: জ্বালানি ও যন্ত্রপাতির অভাবে চতুর্মুখী সংকটে কৃষক সংসদের নিয়মে এখনো অভ্যস্ত নন নতুন এমপিরা, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক ছন্দ অফিসে আপনার কাজ সামলাবে আপনারই ‘ডিজিটাল যমজ’ দেশের কোটি কোটি ডলার পাচার! : কারা খেলল এই ভয়ংকর খেলা — আর কীভাবে ফিরবে সেই সম্পদ? ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম বাড়ল ২১২ টাকা

বিদ্যুৎ থাকছে না ১০-১৪ ঘণ্টা: নেপথ্যে কয়লা-জ্বালানি সংকট আর বকেয়ার পাহাড়

Reporter Name / ১২ Time View
Update : শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬

বৈশাখের শুরুতেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র দাবদাহ। প্রচণ্ড এই গরমের মাঝেই জনজীবনে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভয়াবহ লোডশেডিং। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার বাইরের গ্রামগঞ্জগুলোতে দিনে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কাছে কেন্দ্রগুলোর বিপুল পাওনা, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং কয়লা সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন তলানিতে নেমেছে। ফলে চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ ঘাটতি বা লোডশেডিং ২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে।

চাহিদা ও উৎপাদনের বর্তমান চিত্র

গ্রীষ্মের খরতাপে দেশজুড়ে এসি ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বহুগুণ বেড়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পিডিবি হিমশিম খাচ্ছে।

  • বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় দেশে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট।

  • ওই সময়ে উৎপাদন সম্ভব হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৩২৪ মেগাওয়াট।

  • অর্থাৎ, ঘাটতি ছিল প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট। যদিও বিকালের দিকে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কিছুটা বাড়ায় লোডশেডিং ৯০০ মেগাওয়াটে নেমে আসে। তবে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২ নম্বর ইউনিট হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।

আর্থিক সংকট ও পিডিবির বকেয়ার পাহাড়

বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চরম আর্থিক সংকটে ভুগছে। পিডিবির সূত্রমতে, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো মিলিয়ে তাদের কাছে পাওনার পরিমাণ ৪২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই বিপুল বকেয়া পরিশোধ না করা হলে আসন্ন তীব্র গরমে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কার্যত অসম্ভব।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ছে প্রতি ইউনিটে ১২ টাকার বেশি, অথচ পিডিবি তা বিক্রি করছে ৮ টাকারও কমে। ফলে গত বছর ৩৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি পাওয়ার পরও পিডিবির লোকসান ছিল ১৭ হাজার কোটি টাকা। বিশ্ববাজারে ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়ায় এবার এই লোকসানের পাল্লা আরও ভারী হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কয়লা সংকট ও আমদানিতে জটিলতা

দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ৬ হাজার ২০৩ মেগাওয়াট (আদানি বাদে) হলেও, বুধবার দুপুরে তা থেকে মিলেছে মাত্র ৩ হাজার ৬৫৭ মেগাওয়াট। এর পেছনে মূল কারণগুলো হলো:

  • বকেয়া ও পরিবহন ব্যয়: এসএস পাওয়ার (১৩২০ মেগাওয়াট) থেকে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৩০০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা এবাদত হোসেন জানান, পিডিবির কাছে তাদের পাওনা ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার জেরে কয়লা পরিবহনে জাহাজ ভাড়া টনে ৮-১০ ডলার বেড়েছে, যা সরকার দিতে নারাজ। লোকসান এড়াতে তারা আমদানি কমিয়েছেন এবং বর্তমানে তাদের হাতে মাত্র ১ হাজার ৬০০ টন কয়লা মজুত আছে।

  • মাতারবাড়ী ও অন্যান্য কেন্দ্র: মাতারবাড়ী ১৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে মিলছে মাত্র ১৫০ মেগাওয়াট। পিডিবির কাছে তাদেরও পাওনা ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে ১৬ এপ্রিল ৬০ হাজার টন কয়লা আসায় এখান থেকে উৎপাদন বৃদ্ধির আশা করা হচ্ছে। এছাড়া ১২০০ মেগাওয়াটের আরএনপিএল থেকে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৪০০ মেগাওয়াট।

  • ইন্দোনেশিয়ার নীতি পরিবর্তন: বাংলাদেশের কয়লার শতভাগ আসে ইন্দোনেশিয়া থেকে। কিন্তু দেশটি চলতি বছর কয়লা উত্তোলন ৭৯ কোটি টন থেকে কমিয়ে ৬০ কোটি টনে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা আমদানির বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর নাজুক দশা

কয়লার পাশাপাশি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর পরিস্থিতিও অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। ৫ হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে গত বুধবার উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৭২১ মেগাওয়াট।

  • বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত জানান, অর্থাভাবে বেসরকারি কেন্দ্রগুলো (আইপিপি) ফার্নেস অয়েল আমদানির জন্য এলসি (ঋণপত্র) খুলতে পারছে না। ব্যাংক ঋণ ও কর্মীদের বেতন দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের কাছে অন্তত ৩০টি তেলভিত্তিক কেন্দ্রের বকেয়া প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা।

  • বিপ্পার মহাসচিব কর্নেল (অব.) এআর মোহাম্মদ পারভেজ মজুমদার জানান, কেন্দ্রগুলোর মোট তেল মজুত সক্ষমতা ৩ লাখ ৬০ হাজার টন হলেও বর্তমানে আছে মাত্র ১ লাখ ৪২ হাজার টন। এটি দিয়ে এপ্রিল মাস পার করা গেলেও পরবর্তীতে চরম সংকট দেখা দেবে। কারণ, নতুন করে এলসি খুলে তেল আনতে অন্তত ৪০ দিন সময় লাগবে।

  • বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, তাদের কাছে থাকা ১ লাখ ৯২ হাজার টন তেল দিয়ে সর্বোচ্চ ১৫-১৬ দিন চলা সম্ভব। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য সংকটে আন্তর্জাতিক বাজারে ফার্নেস অয়েলের দাম প্রতি টনে ৪০০ ডলার থেকে লাফিয়ে ৮০০ ডলারে পৌঁছেছে। দেশীয় বাজারেও প্রতি লিটার তেলের দাম ৭৫ টাকা থেকে বেড়ে ৯৪.৬৯ টাকা হয়েছে। এতে তেলভিত্তিক প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ ২০ টাকা থেকে বেড়ে ২৬ টাকায় গিয়ে ঠেকবে।

গ্রামাঞ্চলে সীমাহীন দুর্ভোগ

বিদ্যুৎ ঘাটতির সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে ঢাকার বাইরের সাধারণ মানুষ। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। চট্টগ্রামের লোহাগড়া থেকে একজন ভুক্তভোগী জানান, দিনে-রাতে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টাই তারা বিদ্যুৎহীন থাকছেন। এই অসহনীয় গরমে টানা লোডশেডিংয়ের কারণে বয়স্ক ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে। সামনে গরমের তীব্রতা বাড়লে এই দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ রূপ নেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category