• রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৫ পূর্বাহ্ন

অনাদৃত

বাদল সৈয়দ / ৯ Time View
Update : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় পুরোনো মোটর গাড়ির সূত্র ধরে। পুরোনো বললে ভুল হবে, বলা উচিত অ্যান্টিক গাড়ি।
একটা গবেষণা করছিলাম। বিষয় ‘ভারতে মোটর গাড়ির ইতিহাস।’
একাজে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া হয়েছে। অনেক পুরানো গাড়ি দেখা হয়েছে।
এমন সময় একসুত্রে ভদ্রলোকের খবর পাওয়া গেলো, তাঁর কাছে নাকি নাটোরের রানী ভবানির গাড়ি আছে।
রানী ভবানির গাড়ি!
ইন্টেরেস্টিং, ভেরি ইন্টেরেস্টিং!
ভদ্রলোকের পাত্তা লাগালাম।
দেখা গেলো একসময় খুব নামকরা ব্যবসায়ী ছিলেন। বলা হতো, ‘কিং মেকার।’
এ দেশে রাজা বানানোয় বড় ভূমিকা থাকতো তাঁর।
এরপর হঠাৎ একদিন সব ছেড়েছুঁড়ে শহর থেকে দূরে নিভৃত গ্রামে প্রাসাদ টাইপ এক বাড়িতে থাকেন। সেখান থেকে বের হন না, কারো সাথে মেশেন না।
স্থানীয়দের ধারণা তিনি আধ্যাত্মিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়েছেন। তাই তারা বেশ সমীহ করেন, বিরক্ত করেন না।
তিনিও তাদের দেখাশুনা করেন। তাদের বিপদ-আপদে এগিয়ে আসেন। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল করে দিয়েছেন। কিন্তু সবই দূর থেকে। তাঁকে বাড়ি থেকে বের হতে কেউ দেখেনি। শুধু মাঝে মাঝে বাগানে হাঁটেন।
এমন লোক যে আমি চাইলেই দেখা দেবেন না বা তাঁর গাড়ি দেখতে দেবেন না তা বলাই বাহুল্য।
কিন্তু আমার নীতি হচ্ছে, হাল না ছাড়া। বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সুচাগ্র মেদিনি।
ভদ্রলোক ফোন, সেলফোন, ইন্টারনেট কিছুই ব্যবহার করেন না।অনেক ঝামেলা করে তাঁর ম্যানেজারের নাম্বার জোগাড় করা হলো। কিন্তু তিনি মোটেও উৎসাহ দেখালেন না। তাঁর স্যার নাকি এসব ব্যাপারে মোটেও উৎসাহী নন। প্রায় তিনমাস লেগে থাকার পর অগত্যা ম্যানেজার সাহেব জানালেন, ভদ্রলোক আমাকে গাড়ি দেখতে দিতে রাজি হয়েছেন, তবে তাঁর সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে না।
আমার কাছে এটাই চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো।
নির্ধারিত দিনে ম্যানেজার সাহেব গম্ভীর মুখে গাড়ি দেখালেন। মনে হলো তাঁদের নির্জনতা ভাঙায় তিনি মহাবিরক্ত।
এক কাপ চাও অফার করলেন না।
আমি বিশাল বাড়ির লনে গাড়িটা মনোযোগ দিয়ে দেখলাম, তারপর কাগজে ছোট একটি নোট লিখে ম্যানেজার সাহেবকে বললাম, ‘আপনার স্যারকে সম্ভব হলে এটা দেবেন।’
তিনি আরো বিরক্ত। যাকে বলে কঠিন বিরক্ত।নোটটা গাড়ির মালিককে পৌঁছাবেন বলে মনে হলো না।
দুদিন পর ম্যানেজার সাহেবের ফোন। তাঁর সাহেব আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছেন।
চা পানের আমন্ত্রণ!
পরের শুক্রবার।
ভদ্রলোকের সামনে বসে আছি। শেষ বিকেলের কনে দেখা আলোয় তাঁকে কেমন রহস্যময় মনে হচ্ছে। ঘরে হিম ঠান্ডা, সবচে কম মাত্রায় এসি চলছে। তিনি সাদা লিনেনের প্যান্টের সাথে কালো পলো শার্ট পরেছেন। তাঁর ওপর বাদামী ব্লেজার। মাথায় ফ্যাডোরা টাইপ ক্যাপ।
টেবিলে টি অরগানাইজার, তাতে হরেক রকম টি ব্যাগ, পোরসেলিনের কাপ, প্লেট, রুপার বাটিতে বাদাম আর আখরোট।
তিনি চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন ‘আপনি আমাকে যে নোট পাঠিয়েছেন, তাতে লিখেছেন, আমার গাড়িটা আদৌ রানী ভবানীর নয়, এমনকি নাটোরের কোনো মহারাজারও নয়। আপনার দাবীর ভিত্তি কী জানতে পারি?’
‘খুব সহজ ভিত্তি। আপনিও নিশ্চয় জানেন, কিন্তু বলেন না কেন বুঝতে পারছিনা। তাহলো রানী ভবানী মারা যান ১৮০৫ সালে আর মোটর গাড়ি আবিষ্কার হয় তিনি মারা যাওয়ার আশি বছর পর ১৮৮৫ সালে। সে বছর জার্মানির মার্সিডিজ বেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা কার্ল বেঞ্জ প্রথম তিন চাকার অটোমোবাইল পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি করেন। পরের বছর তিনি এর প্যাটেন্টের অনুমোদন নেন। যদিও তার আগে একজন আমেরিকান একই চেষ্টা করেও অনুমতি পাননি। বেঞ্জ সাহেবের গাড়ি রাস্তার মুখ দেখার আশি বছর আগে রানী ভবানী মারা যান। অতএব তাঁর গাড়ি থাকার প্রশ্নই আসে না। তাঁর উত্তরসুরী রাজাদেরও না। কারণ, এ বংশের শেষ জমিদার রাজা বিশ্বনাথ মায়ের মৃত্যুর পর ১৮০৫ সালেই মাসিক আটশো টাকা সরকারি বৃত্তির অধীনে চলে যান। জমিদারি নিঃশেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁকে এই বৃত্তি দেয়া হয়। সুতরাং তাঁদের গাড়ি থাকার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু আমাদের দেশে ‘রানী ভবানীর গাড়ি ‘ বলে একটি মিথ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, এবং অনেকেই দাবী করেন তার সংগ্রহে রানীর গাড়ি আছে। সম্ভবত মর্যাদা বাড়ানোর জন্য এট করা হয়। কিন্তু খুব অবাক লাগছে, আপনি এটা বলবেন কেন? আপনার তো ভান করার দরকার নেই।’
তিনি কুলকুল করে হাসলেন, ‘লোকে বলে মজা পায়,আমি কিছু বলি না, লুকোচুরি খেলা আর কি?’
তিনি আবার হাসেন, বাচ্চাদের মতো।
তারপর থেকে তিনি আমাকে মাঝে মাঝে ডাকেন। গল্প করেন।
আমার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, তাঁর স্বেচ্ছা নির্বাসনের কারণ। কিন্তু ভদ্রতার কারণে প্রশ্নটি আটকে যায়।
বেশ কিছুদিন পর আবার তাঁর সাথে দেখা। ডিনারে ডেকেছেন। খাওয়া শেষে বিশাল বারান্দায় কফি নিয়ে বসেছি। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। মাঝে মাঝে বাজের আলোয় চমকে উঠছে দূরের পাহাড়।
মনে রাখার মত একটি রাত।
তিনি হঠাৎ বললেন, ‘আমার এ বাড়িটা আপনার কেমন লাগে, বাদল?’
‘অসাধারণ। স্বপ্নের মতো। তবে সিকিউরিটি নিয়ে ভাবি। একদম অজপাড়া। চারিদিকে পাহাড়।।যদি কোন বিপদ হয়? এলাকাটির অনেক দুর্নামও আছে।’
তিনি হালকা হাসেন, ‘আমার ডোবারম্যানগুলো ভেরি স্পেশাল।তাছাড়া, এখানকার লোক ভাবে, আমার আধ্যাত্মিক ক্ষমতা আছে।তারা নাকি মাঝে মাঝে গভীর রাতে আমাকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে শূন্যে ভাসমান এক কিশোরীর সাথে কথা বলতে দেখে। তাই খুব ভয় পায়।’
আবার দুষ্টামির হাসি।
তারপর হঠাৎ ঝুঁকে আসেন,
‘আপনার কখনো জানতে ইচ্ছে করে না, সব ছেড়েছুড়ে আমি এখানে স্বেচ্ছা নির্বাসন কেন নিলাম?’
আমার চোখে ঘোরতর বিস্ময় ফুটে উঠে। কিন্তু অন্ধকারে তা তিনি খেয়াল করেন না।
‘হ্যাঁ, ইচ্ছে করে।কিন্তু জিজ্ঞেস করতে ভদ্রতায় বাঁধে।’
তিনি কিছু বললেন না, কফিতে চুমুক দিয়ে রকিং চেয়ারে দুলতে থাকেন।
একটু পর যেন অনেকদুর থেকে তার কন্ঠ ভেসে আসে, ‘ভাগ্য আমার পক্ষে ছিল সব সময়। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে বিলিওনিয়ার হই। টাকার সাথে ধরা দেয় ক্ষমতা, প্রতিপত্তি। মন্ত্রী বানাই, নামাই। সবচে, বড়ো কথা আমি ব্যাপারটা উপভোগ করি। এভাবে দুনিয়াটা যখন আমার হাতের মুঠোয় তখনই ধ্বস নামে। বিশাল ধ্বস।আমার স্ত্রী সন্তান প্রসবকালে মারা যান। কন্যা সন্তান। আমার স্ত্রী ছিলেন আমার পৃথিবী। একমাত্র পৃথিবী।
প্রথম কদিন আমার কাছে সব অর্থহীন মনে হয়। সব কিছু গুঁড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আমি হচ্ছি জাত ব্যবসায়ী। টাকা কামানো আমার নেশা। একমাত্র নেশা। তাই এ নেশাই আমাকে শোক ভুলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনে। কিন্তু একটা ব্যাপার আমি পারলাম না। সেটা হচ্ছে মেয়ের জন্য নিজের ভেতর মায়া জাগাতে। আমার কেবল মনে হয়, তার জন্য আমার স্ত্রী মারা গেছে, সে তার মাকে হত্যা করেছে। তাই আমি সজ্ঞানে তাকে এড়িয়ে চলতে লাগলাম। সে বড়ো হতে লাগলো আয়াদের কাছে। আমার সাথে তার খুব কম দেখা হয়। কিন্তু, আশ্চর্য কী জানেন, এত অবহেলার পরও সে কীভাবে যেন বাবার ন্যাওটা হয়ে গেলো। আমি গম্ভীরভাবে তাকে এড়িয়ে চলি, কিন্তু প্রতিদিন সে দেখি, নাস্তার টেবিলে এসে বসে আছে, আমি কথা বলি না। রাত করে বাড়ি ফিরে দেখি, সে না খেয়ে বসে আছে।আমি খেয়াল করেও করি না। খেয়ে উঠে যাই। আমাদের মধ্যে কোনো কথা হয় না।
তার স্কুলে বিভিন্ন প্রোগ্রামের চিঠি আসে, সে আমাকে আদুরে গলায় অনুরোধ করে যাওয়ার জন্য।আমি কঠিন কণ্ঠে না করে দেই।
এতকিছুর পরও কিন্তু সে আমার কাছ ছাড়ে না। জন্মদিনে “World’s best Father ‘বলে কেক বানায়।
আমি বিরক্ত হই আর ভাবি এই মেয়ের মধ্যে কি আত্মমর্যাদা বলে কিছু নেই? এতো অবহেলার পরও হ্যাংলার মতো আমার পেছনে লেগে আছে! কিন্তু আমার মেয়ের আত্মমর্যাদা ছিলো। কঠিনভাবেই ছিলো। আমি তা বুঝতে পারি যেদিন সে মারা যায় সেদিন।’
আমি প্রায় লাফ দিয়ে উঠি, ‘কী বলছেন?’
তাঁর কণ্ঠ যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসে, ‘সেদিন ছিল তার স্কুলের নাচের প্রোগ্রাম। কয়েকদিন আগে থেকে সে আমাকে যেতে বলছিলো। কারণ সে নাচবে, বাবাকে দেখাতে চায়।
আমি কী মনে করে নিমরাজি হই, কিন্তু অনুষ্ঠানের দিন আমার জরুরি মিটিং পড়ে যায়। সে যখন শুনে আমি যেতে পারবো না জীবনে প্রথমবারের মতো রাগে ফেটে পড়ে। উঁচু গলায় কথা বলে। তার চোখে তীব্র রাগ আর অভিমান মেশা জল। আমি তা পাত্তা না দিয়ে তার চেয়ে কঠিন কন্ঠে তাকে জানিয়ে দেই, আমাকে যেন কখনই বিরক্ত না করা হয়। সবচে কঠিন যে কথাটি বলি, তাহলো, ‘আমি তোমার বায়োলজিক্যাল ফাদার, ইমোশনাল ফাদার নই। অতএব, আমার কাছে কোনো ইমোশন আশা করোনা।’
‘সেরাতেই আমার মেয়ে আত্মহত্যা করে। আমার ব্যবহারের বিশটি ঘুমের ওষুধ খেয়েছিল সে।
তার বয়স তখন পনের।
তার মৃত্যুর পর আমি বুঝতে পারি আমার মেয়েকে আমি ভালবাসি। উথালপাতাল ভালবাসি। এর চারদিন পর তার সাথে আমার দেখা হয়।’
‘মানে? কী বলছেন আপনি!’
আমার ঠোঁট থেকে বিস্মিত প্রশ্ন ছুটে যায়।
তিনি আমাকে হাত নেড়ে থামিয়ে বলতে লাগলেন, ‘এখানে তখন ছোট একটা বাংলো ছিল। এর পাশেই তাকে কবর দেয়া হয়। সে মারা যাওয়ার তিন দিনের দিন সন্ধ্যায় আমি বারান্দায় একা বসে আছি। টিমটিম করে হারিকেন জ্বলছে, তখন এখানে বিদ্যুৎ আসে নি। হঠাৎ অন্ধকারে সে এলো। আমার রাজকন্যা। আমি স্পষ্ট দেখললাম সে দাঁড়িয়ে আছে। গোলাপী ফ্রক পরে আছে। আমার কী যেন হলো। আমি ছুটে গিয়ে তাকে জাপটে ধরতে চাইলাম। কিন্তু ধরা যায় না। অথচ পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি, সে ডাকছে, বাবা, বাবা, এখানে একা একা ভয় লাগে। খুব ভয় লাগে বাবা।’
‘আমি চিৎকার করে আবার তাকে জড়িয়ে ধরতে যাই কিন্তু পারি না। শূন্যে ভাসতে ভাসতে সে সরে যায়। আমার গলা ফেটে বের হয়ে আসে দলা দলা কান্না, আমি চিৎকার করে বলতে থাকি, মা, মারে, কোনো ভয় নেই। আমি তোর পাশেই আছি, সব সময় থাকব, কোথাও যাব না, কখনোই না, মা, মাগো।’
‘আমি আবার ছূটে গিয়ে তাকে জড়াতে চাই বুকে, কিন্তু সে আবার শূন্যে ভেসে সরে যায়।’
তারপর থেকেই আমার মেয়ের পাশে থাকা। এখান থেকে আমি কোথাও যাবো না। আমার অভিমানী রাজকন্যা ভয় পাবে…।
বাইরে তুমুল বৃষ্টি, কিন্তু সে বৃষ্টির চাইতে অনেক বেশি গতিতে মানুষটার চোখ থেকে জলের ধারা নেমে আসছে। সে জলবিন্দুর জ্যোতি এতো উজ্জ্বল যে অন্ধকারেও তা স্পষ্ট দেখা যায়।

#আসুন মায়া ছড়াই


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category